সোনার দামে আগুন: ট্রাম্প না বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ?
ভারতে সোনার দাম যেন প্রতিদিনই নতুন রেকর্ড গড়ছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বড় বিনিয়োগকারী—সবাই অবাক। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই উত্থানের আসল কারণ কী?
বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক চাপ ও যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝেই সোনার এই দৌড়ে উঠে আসছে এক নাম—ডোনাল্ড ট্রাম্প।
অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ বিশ্ববাজারে এমন এক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, যার প্রভাব সরাসরি পড়ছে স্বর্ণের দামে। তবে এটি কেবল মার্কিন রাজনীতির ফল নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি, যুদ্ধ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নীতি ও ভারতের নিজস্ব বাজার পরিস্থিতিও।
আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার রেকর্ড উত্থান
২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম রেকর্ড ছুঁয়েছে। অক্টোবর মাসে ভারতের বাজারে প্রতি ১০ গ্রাম সোনার দাম ১.১৮ লক্ষ টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যায়—দেশের ইতিহাসে অন্যতম উচ্চতম মূল্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উত্থান একাধিক কারণে একসঙ্গে ঘটছে—রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক সব প্রভাবের সমন্বয়ে।

ট্রাম্পের নীতি ও ‘সেফ-হেভেন ইফেক্ট’
ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে মার্কিন বাজারে অনিশ্চয়তা বেড়েছে।
তাঁর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত—যেমন
- ফেডারেল রিজার্ভে হস্তক্ষেপ,
- আমদানি নীতি পরিবর্তন,
- বিতর্কিত রাজনৈতিক পদক্ষেপ—
এসবই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
যখন বাজার অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়াতে নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝোঁকেন—এটাকেই বলে “Safe Haven Effect”।
সেই নিরাপদ সম্পদের মধ্যে প্রথমেই থাকে সোনা।
অতীতে, ২০১৬ সালে ট্রাম্পের প্রথম জয়ের পরও একই প্রবণতা দেখা গিয়েছিল।
ভূরাজনীতি ও যুদ্ধের প্রভাব
সোনার দামে প্রভাব ফেলছে একাধিক যুদ্ধ ও সংঘাতও—
- ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এখনও থামেনি,
- ইসরায়েল-হামাস সংঘাত আবার জ্বলে উঠেছে,
- চীন-তাইওয়ান উত্তেজনা বেড়েই চলেছে।
এইসব কারণে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে এসে সোনাকে বেছে নিচ্ছেন।
অন্যদিকে, চীন, রাশিয়া, ও ভারতসহ একাধিক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিপুল পরিমাণে সোনা কিনছে নিজেদের রিজার্ভ শক্তিশালী করতে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল জানিয়েছে, ২০২৫ সালে সোনার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ক্রয় পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বাধিক।
ফলে বাজারে চাহিদা বেড়েছে, সরবরাহ কমেছে, দাম স্বাভাবিকভাবেই উর্ধ্বমুখী।

মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার ও বিনিয়োগ মনোভাব
সুদের হার ও মুদ্রাস্ফীতির সম্পর্কও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রাস্ফীতি রুখতে সুদের হার বাড়ালেও বাস্তবে দামের চাপ কমেনি।
ফলে রিয়েল ইন্টারেস্ট রেট বা প্রকৃত সুদের হার কমে যাচ্ছে।
এই অবস্থায়, সোনা আবার বিনিয়োগকারীদের কাছে লাভজনক হয়ে উঠছে—কারণ এটি মূল্য ধরে রাখতে সক্ষম একটি সম্পদ।
ভারতের বাজারে স্থানীয় কারণগুলো
ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সোনা ভোক্তা দেশ।
তাই আন্তর্জাতিক দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের বাজারে।
কিন্তু এর সঙ্গে আরও কিছু স্থানীয় কারণও কাজ করছে—
- রূপির দুর্বলতা: ডলারের তুলনায় রূপির মান কমায় আমদানি খরচ বেড়েছে।
- উৎসব ও বিবাহ মৌসুম: ঐতিহ্যগতভাবে এই সময়ে সোনার চাহিদা বৃদ্ধি পায়।
- আমদানি শুল্ক ও করনীতি: আমদানি খরচ বাড়লে তার বোঝা ভোক্তার ঘাড়েই পড়ে।
- MCX ট্রেডিং: মাল্টি কমোডিটি এক্সচেঞ্জে বিনিয়োগকারীরা বড় পজিশন নেওয়ায় দাম আরও উর্ধ্বমুখী হয়েছে।

ভবিষ্যতে সোনার দাম কি কমবে ?
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই উত্থান স্থায়ী নয়।
যদি মার্কিন ডলার পুনরায় শক্তিশালী হয়, বা যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয়, তাহলে দাম কিছুটা নেমে আসতে পারে।
তবে সাধারণ মানুষের কাছে সোনা এখনও এক বিশ্বস্ত ও নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম, যা মুদ্রাস্ফীতি বা রাজনৈতিক সংকটের সময় সুরক্ষা দেয়।
ভারতে সোনার দাম বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ একত্রে কাজ করছে-ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি তার মধ্যে একটি মাত্র অংশ। আসলে এটি এক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া, যেখানে মার্কিন রাজনীতি, যুদ্ধ, মুদ্রাস্ফীতি, রূপির দুর্বলতা ও মৌসুমি চাহিদা—সব একসঙ্গে মিশে গিয়ে এই “স্বর্ণ র্যালি” তৈরি করেছে।অর্থাৎ, ট্রাম্প হোক বা বিশ্ববাজার—ভারতের সোনার উত্থান এখন এক বাস্তব অর্থনৈতিক প্রতিচ্ছবি, যা দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।



