Shashikanta Halder voter list issue : দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে তিন দশক কাজ করেছেন, শান্তি সেনা হয়ে শ্রীলঙ্কার মাটিতে দেশের পতাকা উড়িয়েছেন — সেই মানুষই আজ নিজের নাম খুঁজে পাচ্ছেন না ভোটার তালিকায়। বয়সের ভারে ন্যুব্জ প্রাক্তন সেনা শশীকান্ত হালদারের এখন একটাই আক্ষেপ — “দেশের জন্য এত কিছু করলাম, আজ নিজের ভোটের অধিকারটাই হারালাম।”
চুঁচুড়া পুরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাপাসডাঙা লিচুতলার এক সাধারণ ঘরে এখন দিন কাটান ৮৭ বছরের শশীকান্তবাবু। বয়সের কারণে শরীরটা আগের মতো আর সাড়া দেয় না, কিন্তু মনে আজও আছে সেনা জীবনের শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেমের সেই অটুট বন্ধন।
🇮🇳 দেশের সেবায় তিন দশক :
১৯৬৪ সালে ভারতীয় সেনায় যোগ দিয়েছিলেন শশীকান্ত হালদার। তখন দেশজুড়ে যুদ্ধপরিস্থিতি। চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাতের সময় দেশের জন্য কাজ করেছেন এই মানুষটি। সেনাবাহিনীর মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ছিলেন তিনি, যেখানে তাঁর মূল কাজ ছিল যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও যানবাহনের মেরামতি ও রক্ষণাবেক্ষণ।
তিনি ফোর্ট উইলিয়াম, লাদাখ, রাজস্থান, জম্মু-কাশ্মীর, আগ্রা— দেশের নানা প্রান্তে দায়িত্ব পালন করেছেন। সহযোদ্ধারা আজও তাঁকে মনে রাখেন একজন “অত্যন্ত শান্ত, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও কর্তব্যপরায়ণ সৈনিক” হিসেবে।
🌏 শান্তি সেনা হয়ে শ্রীলঙ্কা অভিযান:
১৯৮০-র দশকে রাজীব গান্ধীর উদ্যোগে ভারতীয় সেনা পাঠানো হয়েছিল শ্রীলঙ্কায় শান্তি সেনা (IPKF) মিশনে, এলটিটিই বিদ্রোহ দমন করতে। সেই দলেই ছিলেন শশীকান্ত হালদার। বিপদসংকুল মিশনে লড়াই করেছিলেন দেশের স্বার্থে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশের মাটিতে ভারতের ভাবমূর্তি রক্ষা করেছিলেন।
তিনি জানান, “শ্রীলঙ্কায় প্রতিদিনই মৃত্যু ছিল পাশে। বোমা বিস্ফোরণ, গুলির লড়াই, অনিশ্চয়তা — সবকিছুর মধ্যেও আমরা দেশের পতাকা উঁচু রেখেছিলাম।”

🏠 অবসর জীবনে সরল মানুষ, কিন্তু কর্তব্যে অবিচল:
চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন প্রায় ৩৪ বছর আগে। তারপর থেকেই তিনি শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করছেন নিজের এলাকায়। প্রতিবেশীরা বলেন, “শশীকান্তবাবু খুব সাদাসিধে মানুষ। সকালবেলা পেনশন নিয়ে পোস্ট অফিসে যান, পাড়ার বাচ্চাদের সঙ্গে গল্প করেন। কিন্তু দেশ নিয়ে গর্বের কথা বলতে গেলেই চোখ চকচক করে ওঠে তাঁর।”
তাঁর ছেলে বিনয় হালদার জানান, “আমার বাবা জীবনে কখনও কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেননি। দেশের জন্য কাজ করা তাঁর কাছে ছিল গর্বের বিষয়। কিন্তু এখন প্রশাসনের ভুলে তাঁকে যে ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হচ্ছে, তা আমাদের পরিবারের জন্য লজ্জার।”
🗳️ ভোটার তালিকায় নাম উধাও !
শশীকান্ত হালদার নিয়মিত ভোটার। ২০০২ সালের এসআইআর তালিকায় এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ভোটার তালিকায় তাঁর নাম স্পষ্টভাবে ছিল। তিনি নিজেও প্রতিটি নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন।
কিন্তু এবার যখন খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়, তখন দেখা যায় — তাঁর নাম নেই! শুধু তাই নয়, এনুমারেশন ফর্মও পাননি তিনি।
এই নিয়ে হতাশ শশীকান্তবাবু বলেন,- “আমি যখন দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে কাজ করেছি, তখন ভোট দেওয়া আমার অধিকার মনে করেছি। এখন এসে শুনতে হচ্ছে আমার নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে গেছে! এটা কিভাবে সম্ভব ? ”
🧾 প্রশাসনের ব্যাখ্যা ও পরিবারের ক্ষোভ :
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, যাদের নাম খসড়া ভোটার তালিকায় নেই, তাঁদের এনুমারেশন ফর্ম পাঠানো হয় না। তালিকা প্রকাশের পর নতুন করে আবেদন করতে হবে এবং প্রমাণপত্র দিতে হবে।
কিন্তু বিনয় হালদারের প্রশ্ন, “বাবা এখন ৮৭ বছরের মানুষ। তিনি অসুস্থ। আবার নতুন করে ৬ নম্বর ফর্ম ফিলআপ করতে হবে, শুনানিতে যেতে হবে, প্রমাণপত্র দেখাতে হবে— এত কিছু কি সম্ভব?”
তিনি আরও বলেন, “নির্বাচন কমিশনের ভুলের জন্য কেন একজন প্রাক্তন সেনাকে এইভাবে হয়রানি সহ্য করতে হবে? যিনি দেশের জন্য এত কাজ করেছেন, তাঁর সঙ্গে এই অবিচার মেনে নেওয়া যায় না।”

⚖️ একটা বৃহত্তর প্রশ্ন: প্রশাসনিক গাফিলতি নাকি চরম অবহেলা?
এমন ঘটনা নতুন নয়। অনেক ক্ষেত্রেই বয়স্ক নাগরিকদের নাম অজানা কারণে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়। কিন্তু এখানে বিষয়টা শুধু একজন সাধারণ নাগরিকের নয় — এটা একজন প্রাক্তন সেনা অফিসারের সম্মান ও ন্যায্য অধিকারের প্রশ্ন।
চুঁচুড়া এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। পাড়ার মানুষ বলছেন, “যিনি দেশের জন্য নিজের যৌবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁকে যদি আজ প্রমাণ করতে হয় তিনি জীবিত, তাহলে সেটা আমাদের সমাজের লজ্জা।”
💬 পাড়ার মানুষ ও সেনা সহকর্মীদের প্রতিক্রিয়া
প্রতিবেশী প্রবীর মুখার্জি বলেন, “শশীকান্তদা আমাদের এলাকার গর্ব। তিনি সবসময় সোজাসাপটা মানুষ। আজ তাঁর সঙ্গে এমন আচরণ দেখে মন খারাপ হয়ে গেল।”
তাঁর এক প্রাক্তন সহযোদ্ধা ফোনে জানান, “সেনাবাহিনীতে আমরা সবসময় শিখেছি — দেশের নাগরিকদের সেবা করব। কিন্তু এখন দেখি, যারা আমাদের সেবা করেছে, তাদেরই অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।”
🧩 ভোটার তালিকা প্রক্রিয়া ও সিস্টেমের ত্রুটি
নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে ভোটার তালিকা আপডেটের সময় প্রায়ই নাম বাদ পড়ে যায় ভুল তথ্য বা সার্ভার ত্রুটির কারণে। বিশেষ করে যাদের বয়স বেশি, তাঁদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা বেশি হয়।
কিন্তু এই ধরনের ক্ষেত্রে প্রশাসনের উচিত বাড়ি গিয়ে যাচাই করা, বিশেষত যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় পেনশনভোগী হন। শশীকান্তবাবুর মতো একজন কেন্দ্রীয় পেনশনপ্রাপ্ত প্রাক্তন সেনা কর্মীর নাম যদি তালিকা থেকে বাদ যায়, তাহলে তা নিঃসন্দেহে সিস্টেমের গাফিলতি।
🇮🇳 শেষে একটাই কথা
একজন সৈনিক যখন ইউনিফর্ম পরে দেশের সেবা করেন, তখন তিনি নিজের ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, সুখ-দুঃখ সব ত্যাগ করেন। শশীকান্ত হালদারও তাই করেছিলেন। আজ তাঁর বয়সের ভারে ক্লান্ত শরীর হলেও চোখে এখনো সেই দেশের প্রতি মমতা।
তাঁর প্রশ্ন,
“দেশের জন্য আমি যা করেছি, সেটাই কি আমার ভুল ছিল? এখন নিজের নামটাই নেই দেশের ভোটার তালিকায়। তাহলে আমি কে ? ”
এই প্রশ্ন শুধু শশীকান্তবাবুর নয়, এটি আমাদের সমাজ ও প্রশাসনের জন্যও এক আয়না — যেখানে দেখা যাচ্ছে, দেশের জন্য যাঁরা লড়েছেন, তাঁদেরই সম্মান রক্ষায় আমরা কতটা উদাসীন।




