Medinipur News : রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে এসআইআর (Summary Revision of Electoral Roll) প্রক্রিয়ার কাজ। ভোটার তালিকা সংশোধনের এই গুরুত্বপূর্ণ ধাপে প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে ভোটারদের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে এবং Enumeration Form বা এনুমারেশন ফর্ম বিলি করা হচ্ছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার মাঝেই এক চরম বিভ্রাট ঘটেছে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কোলাঘাট ব্লকের রামচন্দ্রপুর গ্রামে।
এক নয়, দু’জন গ্রামবাসীর এনুমারেশন ফর্মে দেখা গেছে ছবি অদলবদলের ঘটনা। ফলে চরম বিভ্রান্তিতে পড়েছেন তারা এবং তাঁদের পরিবার।
📍 ঘটনার শুরু — নাম ঠিক, ছবি ভুল!
রামচন্দ্রপুর গ্রামের দুই বাসিন্দা অশোক ঘাঁটা এবং বিমলা দাস— পাশাপাশি বাড়িতে থাকেন। দু’জনেই নিয়মিত ভোটার, বহু বছর ধরে একই ওয়ার্ডের অন্তর্গত। কয়েকদিন আগে স্থানীয় BLO (Booth Level Officer) রিঙ্কু প্রামাণিক তাঁদের বাড়িতে এনুমারেশন ফর্ম বিলি করেন।
প্রথমে তাঁরা ফর্ম হাতে পেলেও, খুব একটা খেয়াল করেননি। কিন্তু ফর্ম ফিলআপ করতে গিয়ে চোখে পড়ে বড়সড় ভুল —
- অশোক ঘাঁটার ফর্মে তাঁর নাম, ঠিকানা, বয়স সব সঠিক — কিন্তু ছবির জায়গায় দেখা গেছে এক অচেনা মহিলার ছবি।
- অপরদিকে বিমলা দাস নামে এক বৃদ্ধা মহিলার ফর্মে রয়েছে এক পুরুষের ছবি, যা আসলে অশোকবাবুর!
এই অদ্ভুত ছবির অদলবদল দেখে হতভম্ব হয়ে যান দুই পরিবারই।

🗣️ অশোক ঘাঁটা বললেন— “এমন ভুল আগে কখনও দেখিনি”
অশোক ঘাঁটা সাংবাদিকদের বলেন, – “আমি ভোট দিচ্ছি বহু বছর ধরে। আমার নাম ঠিক আছে, ঠিকানাও ঠিক আছে, কিন্তু ছবিটা এক মহিলার! আমি প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি। পরে সবাই দেখিয়ে বলল, সত্যিই ভুল ছবি দেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, – “আমার ফর্মে ওই মহিলা কে আমি জানিই না। যদি ভবিষ্যতে এই ফর্মের ভিত্তিতে কিছু সমস্যা হয়, তবে দায় কার?”
অশোকবাবুর আশঙ্কা, এমন ভুলের কারণে পরবর্তীতে ভোটার তালিকায় তাঁর নাম বা তথ্য নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
👩 অন্যদিকে বিভ্রাটে পড়েছেন বিমলা দাসের পরিবার
অন্য ঘটনায়, রামচন্দ্রপুর গ্রামেরই বাসিন্দা বিমলা দাস, এক প্রবীণা মহিলা। তাঁর এনুমারেশন ফর্মে দেখা গেছে এক পুরুষের ছবি।
বিমলার মেয়ে শর্মিলা দাস বলেন, – “বিএলও ফর্ম দিয়ে গিয়েছিলেন কয়েকদিন আগে। তখন আমরা শুধু নাম ঠিক আছে কিনা দেখেছিলাম। পরে ভালো করে খেয়াল করতেই দেখি, মা’র জায়গায় এক পুরুষের ছবি! এটা কীভাবে সম্ভব বুঝতে পারছি না।”
শর্মিলা আরও বলেন, – “এমন ফর্ম জমা দিলে তো পরের ভোটার তালিকায় মা’র ছবি পুরুষের জায়গায় চলে যাবে। এটা মারাত্মক ভুল। আমরা চাই দ্রুত সংশোধন করা হোক।”
🧾 BLO রিঙ্কু প্রামাণিকের প্রতিক্রিয়া
স্থানীয় ৩৭ নম্বর বুথের BLO রিঙ্কু প্রামাণিক জানিয়েছেন, – “এই বিষয়টি আমি জানার পর সঙ্গে সঙ্গে কোলাঘাট ব্লকের বিডিও অফিসে জানিয়েছি। এটা ডেটা এন্ট্রির সময় ছবি আপলোডের বিভ্রাট থেকে হতে পারে। দু’জনের নাম ও ঠিকানা ঠিক আছে, শুধু ছবিতে ভুল হয়েছে।”
রিঙ্কু প্রামাণিক আরও আশ্বস্ত করেন যে, – “এতে কোনও সমস্যা হবে না। সংশোধন প্রক্রিয়ায় এই ভুলগুলো ঠিক করে দেওয়া হবে। নতুন ফর্ম ইস্যু করা হবে প্রয়োজনে।”

⚙️ ভোটার তালিকা সংশোধনের সময়ই কেন এমন ভুল?
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজ্যের প্রায় প্রতিটি ব্লকে এখন ভোটার তালিকা পুনঃনিরীক্ষণের কাজ চলছে। BLO-রা প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে ভোটারদের তথ্য যাচাই করছেন এবং তা অনলাইনে আপলোড করা হচ্ছে।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, অনেক সময় BLO-রা একাধিক পরিবারের তথ্য একসঙ্গে সংগ্রহ করেন। মোবাইল বা ট্যাবের মাধ্যমে ছবি তোলার সময় যদি সঠিক ফাইল সেভ না হয় বা নেটওয়ার্ক সমস্যায় ডেটা মিশে যায়, তখন এমন “Photo Mismatch Error” ঘটতে পারে।
🗳️ বিডিও অফিসে রিপোর্ট পাঠানো হয়েছে
কোলাঘাট ব্লকের বিডিও অফিস সূত্রে জানা গেছে, বিষয়টি লিখিতভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। প্রশাসনিকভাবে এই দুই ভোটারের ফর্ম পুনরায় যাচাই করা হবে এবং নতুন করে আপলোড করা হবে তাঁদের সঠিক ছবি।
এক আধিকারিক বলেন, – “এটি সম্পূর্ণভাবে একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি। নাগরিকদের কোনও উদ্বেগের কারণ নেই। খসড়া তালিকা প্রকাশের আগে সব তথ্য যাচাই করে সংশোধন করা হবে।”
🧠 নাগরিক সচেতনতার প্রয়োজন
ভোটার তালিকা হালনাগাদ প্রক্রিয়া চলাকালীন সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকতে অনুরোধ করেছেন জেলা নির্বাচন অফিসার। নাগরিকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে—
- এনুমারেশন ফর্ম পাওয়ার পরেই নাম, বয়স, ঠিকানা ও ছবি যাচাই করুন।
- যদি কোনও ভুল বা অসঙ্গতি থাকে, সঙ্গে সঙ্গে BLO বা বুথ অফিসারকে জানান।
- প্রয়োজনে ব্লক অফিসে লিখিত অভিযোগ জমা দিন।
অশোক ঘাঁটা এবং বিমলা দাসের ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, একটিমাত্র ভুল ছবি কতটা জটিলতা তৈরি করতে পারে ভবিষ্যতে।
📢 শেষ কথা
ভোটার তালিকা শুধু একটি প্রশাসনিক নথি নয়, এটি একজন নাগরিকের পরিচয়ের প্রতীক। তাই এমন বিভ্রাট যেন আর না ঘটে, সেই আশাই করছেন রামচন্দ্রপুর গ্রামের মানুষজন।
অশোকবাবুর কথায়, – “আমার শুধু এইটুকুই অনুরোধ — এই ভুলটা যেন দ্রুত সংশোধন হয়। আমি চাই পরের ভোটে নিজের মুখেই ভোট দিই, অন্য কারও মুখে নয়।”
এমন মানবিক আবেদনেই হয়তো মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে — গণতন্ত্রের সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি ‘সঠিক পরিচয়’, আর তা রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার।



