সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে “বঙ্কিম দা” বলে উল্লেখ করায় এবং কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রীর মুখে শোনা “বঙ্কিম দাস চ্যাটাজ্জী” নামকরণে গোটা দেশের রাজনৈতিক মহলে হইচই পড়ে গিয়েছে। সংসদ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে তীব্র বিতর্ক। বাংলাতেও সৃষ্টি হয়েছে বিতণ্ডা—সাহিত্য সম্রাটের নাম ভুল উচ্চারণ কি বঙ্কিমচন্দ্রকে অসম্মান করা হলো?
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—যেখানে নাম উচ্চারণ নিয়ে এত শোরগোল, বাস্তবে কি আমরা তাঁর স্মৃতিধারক স্থানগুলোর প্রতি ততোটাই দায়িত্বশীল? উত্তর ২৪ পরগনার জেলা সদর বারাসাতে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্ন আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। এখানেই রয়েছে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি—যে ম্যাজিস্ট্রেট অফিস ভবন থেকে তিনি একসময় ন্যায়বিচারের হাল ধরেছিলেন, মানুষের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন, আবার সেখান থেকেই শুরু করেছিলেন তাঁর বহু কালজয়ী উপন্যাসের রচনা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আজ সেই ভবনটি উপেক্ষা, অবহেলা ও অযত্নে প্রায় ভগ্নদশায় দাঁড়িয়ে আছে।
যে ভবনে বসে রচনা হয়েছিল বাংলা সাহিত্যের নতুন অধ্যায়
১৮৭৪ থেকে ১৮৮২—এই দুই পর্যায়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বারাসাতে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসনিক কাজে কঠোরতার জন্য তিনি যেমন পরিচিত ছিলেন, তেমনই সাহিত্যচর্চার অদম্য উৎসাহ তাঁকে সমানভাবে সমৃদ্ধ করেছিল।
কথিত আছে, ভবনের দোতলায় ছিল তাঁর চেম্বার—যেখানে তিনি বিচারকার্য পরিচালনার পাশাপাশি বহু উপন্যাসের পটভূমি তৈরি করতেন। নিচতলায় বসতেন কর্মচারীরা, আর সেই ঐতিহাসিক ভবনের নাম ছিল—‘বঙ্কিম ভিলা’।
এই বঙ্কিম ভিলা আজ ভাঙাচোরা দেয়াল, জরাজীর্ণ ছাদ আর অন্ধকার ঘর নিয়ে যেন এক ভুতুড়ে বাড়ি। চারদিকে লতাপাতা, নোংরা আবর্জনা—যেখানে থাকা উচিত ছিল বঙ্কিমচন্দ্রের স্মৃতি সংরক্ষণের নিদর্শন, সেখানে আজ স্রেফ নষ্ট হয়ে যাওয়া ‘সরকারি সম্পত্তি’।

প্রশাসনিক ভবনের মাঝেই লুকোনো অবহেলা
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এই ঐতিহাসিক ভবনটি জেলা আদালত, প্রশাসনিক অফিস এবং জেলা পরিষদ ভবনের একদম মাঝেই। প্রতিদিন শতাধিক সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারী, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, পুলিশ—এই পথ দিয়েই যাতায়াত করেন। তবুও বাড়িটি যেন সবার চোখের সামনেই লুকিয়ে আছে।
বছরের পর বছর নির্বাচন এসেছে, পাল্টেছে ক্ষমতার কেন্দ্র, জোড়া-জোড়া প্রতিশ্রুতিও এসেছে—কিন্তু বাস্তবে বঙ্কিমচন্দ্রের স্মৃতিসৌধ সংস্কারের জন্য কোনও উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। সংস্কারের অঙ্গীকার বারবার দেওয়া হলেও তা কাগজে-কলমেই থেকে গেছে।
ঋষি বঙ্কিম এবং দেশের শ্রদ্ধা—কিন্তু বাংলার মাটিতে অবহেলা
যখন দেশজুড়ে বন্দেমাতারামের সার্ধশতবর্ষ উদযাপিত হচ্ছে, যখন জাতীয় স্তরে বঙ্কিমচন্দ্রের অবদান নতুন করে আলোচিত, তখন তাঁর নিজের বাংলায়, তাঁর কর্মভূমিতে এমন উদাসীনতা লজ্জারই।
যে মানুষটি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে সাংস্কৃতিক বিপ্লব এনে দিয়েছিলেন, ‘আনন্দমঠ’-এর মতো সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছিলেন, সেই মানুষটির স্মৃতি আজ নিজের বাড়ির উঠোনেই অবহেলিত।

স্থানীয় মানুষের ক্ষোভ ও অপেক্ষা
স্থানীয়দের কথায়—
“রাজনীতি করে সবাই লাভ নিতে চায়, কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্রকে সম্মান দেওয়ার কথা কেউ ভাবে না। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বাড়ি আজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, অথচ কোনও সরকারই এই বাড়ি সংরক্ষণে উদ্যোগ দেখাচ্ছে না।”
অনেকে আরও বলছেন, এই বাড়িটিকে জাদুঘর বা সংস্কৃতিকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেত। স্কুল-কলেজের ছাত্ররা এখানে এসে জানতে পারত বঙ্কিমচন্দ্রের প্রশাসনিক ভূমিকা ও সাহিত্যিক অবদান। অথচ সবই আজ ধুলোয় ঢেকে গেছে।
বঙ্কিমচন্দ্র কি তবে পরদেশেই বেশি সম্মানিত?
কথা উঠছে—ভারতের বহু রাজ্যে বঙ্কিমচন্দ্রের স্মৃতিতে মনুমেন্ট, রাস্তা, গ্রন্থাগার নির্মিত হয়েছে। কিন্তু বারাসাতে তাঁর স্মৃতিসৌধ আজ অযত্নের প্রতীক।
বাংলা সাহিত্য ও চিন্তার ভিত্তি নির্মাতা মানুষটি নিজের রাজ্যেই যথাযথ সম্মান পাচ্ছেন না—এটাই সবচেয়ে বেদনার।
কবে এই ঐতিহাসিক ভবনটি পুনর্জীবন পাবে?
কবে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর যোগ্য মর্যাদা ফিরে পাবেন?
স্থানীয়রা একটাই আশা করছেন—যে দিন রাজনীতির বিতর্কের বদলে বাস্তব সম্মান দেওয়ার উদ্যোগ শুরু হবে, সেই দিনই উপযুক্তভাবে মূল্যায়িত হবেন সাহিত্য সম্রাট।



