মুখ্যমন্ত্রীর পথশ্রী প্রকল্পের উদ্বোধন মঞ্চেই রীতিমতো অস্বস্তিতে তৃণমূল শিবির। নন্দকুমারের তৃণমূল বিধায়ক সুকুমার দে যে মন্তব্য করেছেন, তা শুধু অনুষ্ঠানস্থলেই নয়—সোশ্যাল মিডিয়া থেকে রাজনৈতিক মহল পর্যন্ত আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। সরকারি প্রকল্পের উদ্বোধনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের সরকারের উন্নয়ন নিয়ে এভাবে প্রশ্ন তোলেন খুব কমই। কিন্তু নন্দকুমারের বিধায়ক যে ভাষায় সমস্যার কথা তুলে ধরলেন, তা কার্যত শাসকদলের অস্বস্তি বাড়িয়েছে।
🔶 “গাড়ি উল্টে যেতে দেখি, কিন্তু কাঁচ তুলে এড়িয়ে যাই”—মঞ্চে বিস্ফোরণ বিধায়কের
মুখ্যমন্ত্রীর পথশ্রী প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নন্দকুমারের বিধায়ক সুকুমার দে। সেই মঞ্চেই তিনি বলেন—
“এই রাস্তায় প্রতিদিন গাড়ি উল্টে যেতে দেখি। চোখের সামনে দুর্ঘটনা দেখি, কিন্তু গাড়ির কাঁচ তুলে এড়িয়ে যেতে হয় আমাকে। রাস্তাটি এতটাই খারাপ যে কিছুই করার উপায় নেই।”
একই সঙ্গে তিনি আরও বলেন—
“আমরা বুক ফাটিয়ে প্রচার করি উন্নয়নের কথা। কিন্তু কেউ বার্ধক্য ভাতার কথা বললে আমাদের লুকোতে হয়, মুখ লুকিয়ে চলে যেতে হয়।”
সরকারি মঞ্চে নিজের দলের কাজকর্ম নিয়ে বিধায়কের এমন বক্তব্যে উপস্থিত অতিথিরা হতচকিত। শোনা যাচ্ছে, তাঁর বক্তব্য শেষ হওয়ার পর মঞ্চের পরিবেশ কিছুটা থমথমে হয়ে ওঠে।

🔶 নন্দকুমার–হাই রোডের বেহাল দশা—বছরের পর বছর অনাহূত যন্ত্রণা
স্থানীয়দের অভিযোগ—
নন্দকুমার বাজার থেকে নন্দকুমার হাই রোড পর্যন্ত কানেক্টিং রাস্তা দীর্ঘদিন ধরেই বেহাল।
- প্রতিদিনই দুর্ঘটনা
- গাড়ি উল্টে যাওয়া নিত্যদিনের ঘটনা
- ধুলোর জেরে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন বাসিন্দারা
- দোকানপাটে ব্যবসা কমে গেছে
- রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া পর্যন্ত কঠিন
এমনকি অভিযোগ আছে—
বিধায়ক নিজেও দিনে একাধিকবার এই রাস্তায় চলাচল করার সময় লাফিয়ে লাফিয়ে পার হতে বাধ্য হন।
এই রাস্তা মেরামতের দাবিতে বহুবার অভিযোগ জানানো হলেও সমাধানের কোনও উদ্যোগ দেখা যায়নি।
🔶 ৭ কোটি টাকার দাবি—১০ দিনের ডেডলাইন
বিতর্ক বাড়তে থাকলে পরে নিজের বক্তব্য স্পষ্ট করতে সুকুমার দে জানান—
- রাস্তা সম্পূর্ণ সংস্কারের জন্য প্রয়োজন ৭ কোটি টাকা
- আপাতত তিনি অস্থায়ী মেরামতের কাজ শুরু করবেন
- তিনি রাস্তাটি ঠিক করার জন্য সময় চেয়েছেন ১০ দিন
- ভবিষ্যতে পুরো কাজটি যাতে সম্পূর্ণ করা হয়, সেই ব্যবস্থাও করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন
তবে তাঁর এই প্রতিশ্রুতি নিয়েও ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। তাঁদের প্রশ্ন—
“১০ মাসে রাস্তা সারলেন না, এবার ১০ দিনে কি হবে?”
অনেকেই কটাক্ষ করে বলেন—
“৫ বছরে ঘুম ভাঙেনি, ১০ দিনে কি ভাঙবে?”

🔶 বিরোধীদের কটাক্ষ—‘পথশ্রী নয়, হতশ্রী’
ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরব হয়েছে বিজেপি।
জেলার বিজেপি নেতা সুকান্ত চৌধুরী বলেন—
“১৪ বছরে রাস্তাটা ঠিক করতে পারেননি, এখন বলছেন ১০ দিনে সারাবেন? এটা পথশ্রী নয়, হতশ্রী প্রকল্প।”
তিনি আরও দাবি করেন—
এই ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট—শাসকদল নিজেরাই বুঝতে পারছে, মানুষের সামনে তাদের উন্নয়নের প্রচার ধোপে টিকছে না।
🔶 শাসকদলে অস্বস্তি—বিধায়ক কি ‘সত্যি’ বলে ফেললেন?
তৃণমূল শিবিরের একাংশের মতে, বিধায়ক হয়তো মানুষের ক্ষোভের কথা তুলে ধরতে গিয়ে অতিরিক্ত হতাশাজনক মন্তব্য করে ফেলেছেন। অন্যদিকে আবার রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি—
এটি “অন্তর্দ্বন্দ্বের” ইঙ্গিতও হতে পারে।
কারণ সরকারি মঞ্চে এমন মন্তব্য সাধারণত দল অনুমোদন করে না।
এদিকে অনেক সাধারণ মানুষের মতে—
বিধায়ক নিজের অসহায়তার কথা প্রকাশ করেছেন। হয়তো তিনি প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ না পেয়ে হতাশ হয়ে এমন মন্তব্য করেছেন।
🔶 প্রশ্ন উঠছে—উন্নয়ন কি সত্যিই চোখে দেখা যাচ্ছে?
ঘটনাটি সামনে আসতেই প্রশ্ন উঠছে—
- রাজ্যের উন্নয়নের যে ছবি তুলে ধরা হয়, তা কি বাস্তবে মিলছে?
- সরকারি প্রকল্পের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে?
- মাটিতে কাজ কতটা সম্পূর্ণ হচ্ছে?
- বিধায়ক নিজে অসন্তুষ্ট হলে, জনগণ কি করবে?
🔶 সামনে বড় লড়াই—রাস্তা সারবে তো?
এখন দেখার—
বিধায়কের চাওয়া ১০ দিনের মধ্যে রাস্তার অস্থায়ী কাজ শুরু হয় কি না।
এবং দীর্ঘমেয়াদে ওই রাস্তার সম্পূর্ণ সংস্কারে সরকার আসলেই ৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করে কি না।
একদিকে পথশ্রী প্রকল্পের উদ্বোধন; অন্যদিকে বিধায়কের বেফাঁস মন্তব্য—
পরিস্থিতি যে শাসকদলের জন্য অস্বস্তিকর, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।



