পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে সাধারণ মানুষের অসুবিধা অনেক পুরনো সমস্যা। অভিযোগ নিতে গড়িমসি, দুর্ব্যবহার, রাজনৈতিক চাপ—এসব কারণে বহু মানুষ থানার দোরগোড়ায় যেতে ভয় পান বা অস্বস্তি বোধ করেন। এবার সেই সমস্যার সমাধান নিয়ে এগিয়ে এল পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পুলিশ প্রশাসন। জেলার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মিথুন কুমার দে একটি নতুন হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর চালু করে সাধারণ মানুষের কাছে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর জন্য সরাসরি ও স্বচ্ছ পথ খুলে দিলেন।
নতুন চালু হওয়া হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরটি হলো ৭০৪৭৯৮৯৮০০। এই নম্বরে যে কেউ লিখিত বার্তা, ছবি, অডিও বা ভিডিও পাঠিয়ে সহজেই পুলিশের কোনও অনিয়ম বা দুর্ব্যবহারের বিরুদ্ধে অভিযোগ নথিভুক্ত করতে পারবেন। অভিযোগ পৌঁছেই তা জেলা পুলিশ হেডকোয়ার্টারের নজরে যাবে, এবং আশ্বাস অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শুধু তাই নয়, অভিযোগ যদি সত্য প্রমাণিত হয়, সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মীর বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন পুলিশ সুপার।

অনেক সময় দেখা যায়, রাজনৈতিক দল বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে গেলে থানায় গিয়ে হেনস্তার মুখে পড়েন সাধারণ মানুষ। কিছু ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার অভিযোগ নিতে অস্বীকারও করেন। এই ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সেজন্যই নতুন এই ডিজিটাল অভিযোগ ব্যবস্থার সূচনা বলে মনে করছে প্রশাসনিক মহল। নাগরিকরা প্রত্যক্ষভাবে জেলা পুলিশের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাদের অভিজ্ঞতা জানাতে পারবেন, ফলে অভিযোগ গোপন রাখার ভয়ও থাকবে না।
অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়াও অত্যন্ত সহজ। হোয়াটসঅ্যাপে প্রমাণসহ অভিযোগ পাঠালেই তা রেকর্ড হবে। জেলা পুলিশ হেডকোয়ার্টারের বিশেষ টিম অভিযোগ যাচাই করে প্রয়োজনীয় তদন্ত শুরু করবে। পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, “পুলিশ যদি ভুল করে, বা মানুষের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে, তাহলে তার দায় অবশ্যই পুলিশের। তাই স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং জনগণের আস্থা আরও বাড়াতে এই উদ্যোগ।”
এছাড়াও জেলা পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন তিনি। ট্রাফিকের দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মীরা রাস্তার ধারের প্রত্যেক কার্যক্রমে যাতে নিয়ম মেনে আচরণ করেন, তা নিশ্চিত করতে তাঁদের বুকের সামনে বাধ্যতামূলকভাবে বডি-ক্যাম (Body Camera) রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ট্রাফিক ডিউটির সময় যে কোনও পুলিশ অফিসারের কাছে যদি বডি-ক্যাম না থাকে, তাহলে সেই তথ্যও নাগরিকেরা সরাসরি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরেই রিপোর্ট করতে পারেন।
পুলিশ সুপারের বক্তব্য, বডি-ক্যামের মাধ্যমে পুলিশ ও নাগরিক উভয়ের আচরণের রেকর্ড থাকবে, ফলে কোনও পক্ষই মিথ্যা অভিযোগ বা দুর্ব্যবহার করতে পারবেন না। এর ফলে ট্রাফিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা যেমন বাড়বে, তেমনই পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থাও ফেরানো সম্ভব হবে।

নাগরিক সচেতনতা বাড়াতে এবং পুলিশি ব্যবস্থার উন্নতির জন্য এই ধরনের পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রযুক্তি নির্ভর অভিযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে দূর্নীতি কমানোর পাশাপাশি পুলিশের ভেতরে দায়বদ্ধতা আরও জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে। জেলা পুলিশের এই উদ্যোগ রাজ্যের অন্যান্য জেলা বা রাজ্যগুলোতেও মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে।
পুলিশ প্রশাসনের একাংশ মনে করছে—দুর্নীতি বা অনিয়মের অভিযোগ প্রতিবছরই বাড়ছে। থানায় গিয়ে অভিযোগ করতে না পারার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে পুলিশের প্রতি ক্ষোভ ও অবিশ্বাস জন্ম নিচ্ছে। সেই পরিস্থিতিতে ফোনে কয়েক সেকেন্ডে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে সাহস জোগাবে বহু মানুষকে।
সাধারণ মানুষের একাংশ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। তাঁদের মতে, এখন আর থানায় গিয়ে ঝামেলায় না পড়ে সরাসরি জেলার উচ্চ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ পাঠানো যাবে। অনেকেই মনে করছেন, এই ব্যবস্থা কার্যকরভাবে কাজ করলে পুলিশের সামগ্রিক আচরণেও পরিবর্তন আসবে।
সব মিলিয়ে, পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পুলিশের এই পদক্ষেপ মানুষের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ আরও সহজ করে দিল। প্রশাসনের আশা—এই উদ্যোগ পুলিশের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করবে।



