পাকিস্তানে কি এবার পাল্টে যেতে চলেছে ক্ষমতার সমীকরণ?
দিন যত যাচ্ছে, পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি ততই জটিল আকার নিচ্ছে। অর্থনৈতিক সংকট, পাহাড়সম ঋণ, লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি এবং বেকারত্বে জর্জরিত দেশটি এমনিতেই চরম অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে। তার উপর দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সন্ত্রাসবাদ ও সেনা-নির্ভর শাসনব্যবস্থা সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে এবার রাস্তায় নামল পাকিস্তানের জেন জি প্রজন্ম। আর তাদের এই আন্দোলন ঘিরেই নতুন করে প্রশ্ন উঠছে—শেহবাজ শরিফ সরকারের ভবিষ্যৎ কি এবার সত্যিই সংকটে?
সম্প্রতি পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের (PoK) মুজাফ্ফরাবাদ শহর থেকে যে বিক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠেছে, তা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে দেশের অন্যান্য অংশে। প্রথমে শিক্ষাক্ষেত্রের দাবিদাওয়া নিয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু হলেও, অল্প সময়ের মধ্যেই তা রূপ নিয়েছে সরকারবিরোধী বৃহত্তর গণআন্দোলনে। আন্দোলনের নেতৃত্বে রয়েছে মূলত জেন জি প্রজন্মের পড়ুয়া ও তরুণরা, যারা অন্যায়ের সঙ্গে আর আপস করতে নারাজ।

কী থেকে শুরু এই বিক্ষোভ?
বিক্ষোভের সূচনা হয় মুজাফ্ফরাবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়ুয়াদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ হঠাৎ করেই অস্বাভাবিকভাবে ফি বৃদ্ধি করেছে। পাশাপাশি পরিকাঠামোগত সুবিধা, হস্টেল, নিরাপত্তা ও পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়েও একাধিক অভিযোগ উঠেছে। প্রথম দিকে পড়ুয়ারা শান্তিপূর্ণ অবস্থান-বিক্ষোভ ও মিছিলের মাধ্যমে দাবি জানালেও, পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায় এক চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর।
গত সপ্তাহে এক অজ্ঞাত পরিচয় বন্দুকধারীর গুলিতে কয়েকজন পড়ুয়া আহত হন। এই ঘটনাই কার্যত আগুনে ঘি ঢালে। ক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায় নেমে টায়ার জ্বালায়, সরকারি সম্পত্তিতে ভাঙচুর চালায় এবং “শেহবাজ শরিফ হায় হায়” স্লোগানে গোটা মুজাফ্ফরাবাদ শহর কাঁপিয়ে তোলে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী নামানো হলেও উত্তেজনা কমেনি।
সেনার ছায়ায় গণতন্ত্র, ক্ষোভে ফুঁসছে তরুণ সমাজ
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিক্ষোভ শুধুমাত্র শিক্ষাক্ষেত্রের সমস্যায় সীমাবদ্ধ নেই। এর নেপথ্যে রয়েছে বহুদিনের জমে থাকা ক্ষোভ। পাকিস্তানে বকলমে সেনা শাসন চলার অভিযোগ নতুন নয়। নির্বাচিত সরকার থাকলেও প্রকৃত ক্ষমতা সেনা প্রধানের হাতেই—এমন ধারণা দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রবল।
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে জেলবন্দি করা, সংবিধানে পরিবর্তন এনে সেনা প্রধান আসিফ মুনিরের ক্ষমতা বাড়ানো এবং বিরোধী কণ্ঠ রোধ করতে প্রশাসনিক দমন—এই সবকিছু মিলিয়ে জেন জি প্রজন্মের মধ্যে তৈরি হয়েছে গভীর অসন্তোষ। তারা মনে করছে, গণতন্ত্র কার্যত শিকেয় উঠেছে।

সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধের পথে পাকিস্তান?
এই আন্দোলনের বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়া। এক্স (পূর্বতন টুইটার), ফেসবুক ও ইউটিউবের মাধ্যমে মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ছে আন্দোলনের ভিডিও, লাইভ আপডেট ও সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ। আর সেখানেই আতঙ্কিত শেহবাজ সরকার।
সম্প্রতি পাকিস্তানের আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার আকিল মালিক এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলি যদি সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা না করে, তাহলে সেগুলি নিষিদ্ধ করার পথে হাঁটতে পারে প্রশাসন। তাঁর দাবি, ইমরান খান ও তাঁর সমর্থকরা সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে হিংসা ও অস্থিরতা ছড়াচ্ছে।
তিনি আরও জানান, এক্স প্ল্যাটফর্মকে পাকিস্তানে অফিস খোলার জন্য অনুরোধ জানানো হলেও এখনও পর্যন্ত কোনও ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে সরকার।
বাংলাদেশ, নেপালের পর পাকিস্তান?
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটাই বাংলাদেশ ও নেপালের সাম্প্রতিক ছাত্র-তরুণ আন্দোলনের সঙ্গে তুলনীয়। সেখানেও জেন জি প্রজন্মই ছিল মূল চালিকাশক্তি। দুর্নীতি, দমননীতি ও গণতন্ত্রহীনতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে শেষ পর্যন্ত তারা শাসনব্যবস্থাকে বড় ধাক্কা দিয়েছিল।
তাহলে কি পাকিস্তানেও একই ছবি অপেক্ষা করছে? প্রশ্ন উঠছে—শেহবাজ শরিফ কি আদৌ এই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবেন, নাকি আরও বড় রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে এগোচ্ছে প্রতিবেশী দেশটি?
একটি বিষয় স্পষ্ট—পাকিস্তানের তরুণ প্রজন্ম আর চুপ করে বসে থাকতে রাজি নয়। তাদের এই বিদ্রোহ কেবল শুরু, নাকি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত—তা বলবে সময়।



