বাংলার রাজনীতিতে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক যুবভারতী কাণ্ড ফের দেখিয়ে দিল—এই রাজ্যে ধর্ম, খেলা, সংস্কৃতি, এমনকি আন্তর্জাতিক ফুটবল তারকার উপস্থিতিও শেষ পর্যন্ত রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এসে দাঁড়ায়। লিওনেল মেসির কলকাতা সফর ঘিরে তৈরি হওয়া বিশৃঙ্খলা ও ক্ষোভের আবহে এবার নতুন করে বিতর্ক উসকে দিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুনাল ঘোষ। রবিবার তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলল, এই ঘটনার পিছনে নাকি শুধু রাজ্য রাজনীতি নয়, দিল্লির দিক থেকেও কোনও চক্রান্ত থাকতে পারে।
কলকাতা কেন মেসিকে সঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারল না, অথচ হায়দরাবাদ পারল—এই প্রশ্ন ঘিরেই শুরু হয়েছে বিস্তর আলোচনা। হাজার হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কেটে স্টেডিয়ামে বসেও দর্শকরা মেসিকে দেখতে না পাওয়ায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সেই ক্ষোভ পরিণত হয় ভাঙচুরে, বিশৃঙ্খলায়। ঘটনার পরই গ্রেফতার করা হয় বেসরকারি আয়োজক শতদ্রু দত্তকে। কিন্তু সেখানেই প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই—কেন শুধু আয়োজক? কেন ক্রীড়ামন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে কোনও প্রশ্ন উঠছে না?

কুনাল ঘোষের বক্তব্যে রাজনীতির নতুন ইঙ্গিত
এই আবহেই কুনাল ঘোষের মন্তব্য নতুন মাত্রা যোগ করেছে বিতর্কে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, যুবভারতী কাণ্ডকে ব্যবহার করে কলকাতাকে এবং গোটা বাংলাকে কালিমালিপ্ত করার কোনও বৃহত্তর ষড়যন্ত্র আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই বেসরকারি আয়োজকের সঙ্গে বিজেপি শাসিত রাজ্য কিংবা কেন্দ্রের কোনও মহলের যোগাযোগ ছিল কি না, সেটাও তদন্তের আওতায় আসা উচিত।
কুনাল ঘোষ বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে। ফলে এখনই আমরা ঘটনার খুঁটিনাটি নিয়ে মন্তব্য করব না। তবে এটাও তো দেখা দরকার, এই ইভেন্টের আয়োজকের সঙ্গে বিজেপি শাসিত রাজ্য বা কেন্দ্রের কোনও স্তরে যোগাযোগ ছিল কি না।”
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়েই তিনি কার্যত ইঙ্গিত দেন দিল্লির দিকে। তাঁর প্রশ্ন—কলকাতার ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য কি অন্য কোথাও থেকে সুতো টানা হয়েছে? এই আয়োজকের সঙ্গে “দিল্লির চক্রান্তকারীদের” কোনও যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটাও কি তদন্তে দেখা উচিত নয়?
গেরুয়া পতাকা বিতর্ক ও বিজেপিকে নিশানা
প্রসঙ্গত, যুবভারতী কাণ্ডের পর স্টেডিয়ামের ভিতরে গেরুয়া পতাকার উপস্থিতি নিয়েও সরব হয়েছিলেন কুনাল ঘোষ। সেদিনই তিনি বিজেপির বিরুদ্ধে তোপ দেগে বলেছিলেন, এই ধরনের ঘটনাকে রাজনৈতিক রঙ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এবার তাঁর সাম্প্রতিক মন্তব্যে সেই ইঙ্গিত আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
তৃণমূলের অন্দরমহলে অনেকেই মনে করছেন, এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিজেপি বনাম তৃণমূল রাজনৈতিক লড়াই আরও তীব্র হতে চলেছে। কারণ, একদিকে রাজ্যের শাসক দল বলছে, বাংলার সম্মান নষ্ট করার ষড়যন্ত্র হয়েছে। অন্যদিকে বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছে, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ঢাকতেই কি সব কিছুর দায় বাইরের শক্তির ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে?

তদন্ত কমিটি ও রাজনৈতিক সংযম
ঘটনার পরপরই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কুনাল ঘোষও সেই সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে বলেন, তদন্ত চলাকালীন বিস্তারিত মন্তব্য না করাই সমীচীন। তবুও তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে আসছে “দিল্লি যোগ”-এর প্রসঙ্গ, যা রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
নাগরিক মহলের প্রতিক্রিয়া
এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝে সাধারণ নাগরিকদের একাংশ ভিন্ন সুরে কথা বলছেন। তাঁদের মতে, কুনাল ঘোষ বরাবরের মতোই সব বিষয়কে রাজনৈতিক চশমায় দেখছেন। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে খোলা মনে বিশ্লেষণ না করলে, সমস্যার প্রকৃত কারণ কখনওই সামনে আসবে না। কেন নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ফাঁক রইল, কেন দর্শক ব্যবস্থাপনা ব্যর্থ হলো, কেন আন্তর্জাতিক মানের ইভেন্টে সমন্বয়ের অভাব দেখা গেল—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না খুঁজে শুধু রাজনৈতিক দোষারোপে ব্যস্ত থাকলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আবারও ঘটতে পারে।
যুবভারতী কাণ্ড আপাতত শুধুই একটি ইভেন্ট ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা নয়, তা ক্রমশ রূপ নিচ্ছে বড় রাজনৈতিক বিতর্কে। কুনাল ঘোষের দিল্লিমুখী ইঙ্গিত সেই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। তদন্ত কমিটির রিপোর্টই শেষ পর্যন্ত ঠিক করবে—এটা নিছক অব্যবস্থা, নাকি এর নেপথ্যে সত্যিই কোনও বৃহত্তর রাজনৈতিক চক্রান্ত লুকিয়ে আছে।



