রাজনৈতিক প্রচারের ভিন্নধর্মী ছবি দেখা গেল হুগলির চুঁচুড়ায়। মহিলাদের কণ্ঠে পঞ্চালি পাঠের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সূচনা হল তৃণমূল কংগ্রেসের নতুন প্রচার কর্মসূচি ‘উন্নয়নের পাঁচালি’। মঙ্গলবার চুঁচুড়া ক্লক টাওয়ার চত্বর থেকে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন চুঁচুড়ার বিধায়ক অসিত মজুমদার। অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ ছিল—প্রচারের জন্য ব্যবহৃত ই-রিকশা ট্যাবলোর চালকের আসনে নিজেই বসে পড়েন বিধায়ক।
এই কর্মসূচির মাধ্যমে রাজ্য সরকারের গত দেড় দশকের উন্নয়নমূলক কাজ ও জনমুখী প্রকল্পগুলির কথা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস।
মহিলাদের পঞ্চালি পাঠে কর্মসূচির সূচনা
কর্মসূচির শুরুতেই তৃণমূল কংগ্রেসের মহিলা কর্মীরা সমবেত কণ্ঠে ‘উন্নয়নের পাঁচালি’ পাঠ করেন। প্রচলিত ধর্মীয় পঞ্চালির আদলে তৈরি এই পাঠে উঠে আসে রাজ্য সরকারের বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্প—কন্যাশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, স্বাস্থ্যসাথী, সবুজসাথী, শিক্ষাশ্রী-সহ একাধিক উদ্যোগের সাফল্যের কথা।
মহিলা কর্মীদের কণ্ঠে উন্নয়নের কথা তুলে ধরার মধ্য দিয়ে কর্মসূচিতে একটি সাংস্কৃতিক ও আবেগঘন রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক মহলের একাংশ।
১২টি ই-রিকশা ট্যাবলোর উদ্বোধন
চুঁচুড়া ক্লক টাওয়ার থেকে মোট ১২টি ই-রিকশা ট্যাবলোর শুভ সূচনা করা হয়। প্রতিটি ই-রিকশায় সাজানো হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের উন্নয়নের ছবি, পোস্টার ও বার্তা। এই ই-রিকশাগুলি আগামী দিনে চুঁচুড়া বিধানসভা কেন্দ্রের প্রতিটি বুথ, পাড়া ও মহল্লায় ঘুরে মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করবে।
বিধায়ক অসিত মজুমদার জানান, “আজ থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে ‘উন্নয়নের পাঁচালি’ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। ই-রিকশা ট্যাবলোর মাধ্যমে আমরা ঘরে ঘরে সরকারের কাজের কথা তুলে ধরব।”

বিধায়কের বার্তা
কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অসিত মজুমদার বলেন,
“আমাদের দলের মহিলা কর্মীরাই হলেন লক্ষ্মীস্বরূপ। যেমন ঘরে ঘরে মহিলারা পঞ্চালি পাঠ করেন, তেমনই এবার পাড়া-মহল্লায় উন্নয়নের পঞ্চালি পাঠ হবে।”
তিনি আরও বলেন,
“গত ১৫ বছরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে রাজ্য সরকার মানুষের জন্য কী কী কাজ করেছে, তারই বিবরণ এই পঞ্চালিতে তুলে ধরা হয়েছে। এই প্রচার মানুষের কাছে সহজ ভাষায় উন্নয়নের কথা পৌঁছে দেবে।”
ধর্ম বনাম রাজনীতি প্রসঙ্গে মন্তব্য
সাম্প্রতিক কিছু রাজনৈতিক বিতর্কের প্রেক্ষিতে বিধায়ক তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করে দেন, তৃণমূল কংগ্রেস ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে না। তিনি বলেন,
“লক্ষ কণ্ঠে গীতা পাঠ একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছিল। কিন্তু আমরা ধর্মকে রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার করি না। তৃণমূল কংগ্রেস সারা বছর মানুষের পাশে থাকে—সেটাই আমাদের রাজনীতি।”
এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে বিরোধীদের সমালোচনার জবাব দেওয়ার পাশাপাশি দলের অবস্থান স্পষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত।
ই-রিকশা চালিয়ে প্রচারের বার্তা
কর্মসূচির অন্যতম নজরকাড়া মুহূর্ত ছিল, বিধায়ক অসিত মজুমদার নিজে একটি ই-রিকশায় উঠে চালকের আসনে বসা। সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এবং মাঠে নেমে প্রচারের বার্তা দিতেই এই উদ্যোগ বলে জানিয়েছেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ জানান, জনপ্রতিনিধিকে এভাবে প্রচারে নামতে দেখে তাঁরা আগ্রহী হয়েছেন কর্মসূচি সম্পর্কে জানতে।

সাংসদের অনুপস্থিতি নিয়ে ব্যাখ্যা
এদিনের কর্মসূচিতে হুগলি লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় উপস্থিত ছিলেন না। এই প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে অসিত মজুমদার জানান,
“সাংসদ বর্তমানে দিল্লিতে রয়েছেন। সংসদীয় কাজের জন্য তিনি সেখানে গিয়েছেন। আগামী দিনে নিজের লোকসভা কেন্দ্রে দলের অন্যান্য কর্মসূচিতে তিনি অবশ্যই উপস্থিত থাকবেন।”
রাজনৈতিক তাৎপর্য
রাজনৈতিক মহলের মতে, আসন্ন নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে ‘উন্নয়নের পাঁচালি’ কর্মসূচি তৃণমূল কংগ্রেসের একটি কৌশলী পদক্ষেপ। মহিলাদের সামনে রেখে, লোকসংস্কৃতির মাধ্যমে উন্নয়নের বার্তা পৌঁছে দেওয়া—এই দুইয়ের মেলবন্ধন ভোটারদের কাছে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
চুঁচুড়া থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি আগামী দিনে জেলার অন্যান্য অংশেও ছড়িয়ে পড়বে বলে তৃণমূল সূত্রে জানা গেছে।



