পশ্চিমবঙ্গে নিয়োগ দুর্নীতি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়—বরং তা যেন একের পর এক নতুন অধ্যায়ে সামনে আসছে। শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্য রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়। একাধিক নেতা-মন্ত্রীর জেলযাত্রা, তদন্তকারী সংস্থার অভিযান এবং আদালতের কড়া মন্তব্যের পরও দুর্নীতির ছায়া যে এখনও পুরোপুরি কাটেনি, তারই নতুন প্রমাণ মিলল স্কুল সার্ভিস কমিশনের (SSC) সাম্প্রতিক ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ায়।
এসএসসি সূত্রে জানা গিয়েছে, সাম্প্রতিক তথ্য যাচাই পর্বে আরও ১৩২৭ জন অযোগ্য প্রার্থীকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাঁদের বিরুদ্ধে একাধিক ক্ষেত্রে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই প্রার্থীরা নবম-দশম শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত প্রক্রিয়ার অংশ ছিলেন। ভেরিফিকেশন চলাকালীন তাঁদের নথি খতিয়ে দেখার পর একাধিক গুরুতর অসঙ্গতি সামনে আসে।
কীভাবে ধরা পড়ল এই ১৩২৭ জন?
এসএসসি-র তরফে জানানো হয়েছে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া প্রত্যেক প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, কাজের অভিজ্ঞতা, জাতিগত শংসাপত্র (কাস্ট সার্টিফিকেট) এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নথি অত্যন্ত কঠোরভাবে যাচাই করা হচ্ছে। এই ভেরিফিকেশন পর্বেই দেখা যায়, ১৩২৭ জন প্রার্থী অন্তত ৩৫টি ভিন্ন বিষয়ে ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য জমা দিয়েছিলেন।
কমিশনের দাবি অনুযায়ী,
- কেউ কেউ শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে ভুয়ো তথ্য দিয়েছেন
- কারও কাজের অভিজ্ঞতার শংসাপত্রে অসঙ্গতি পাওয়া গিয়েছে
- আবার অনেকের ক্ষেত্রে ভুয়ো বা সন্দেহজনক কাস্ট সার্টিফিকেট জমা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে
এই সমস্ত কারণেই তাঁদের নাম সরাসরি নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে বাতিল করা হয়েছে।
২০১৬ সালের ‘দাগি’ প্রার্থীরাও বাদ যাননি
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, এই তালিকায় এমন প্রার্থীরাও রয়েছেন, যাঁরা ২০১৬ সালের নিয়োগ দুর্নীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ। সেই সময় যাঁদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন উঠেছিল, তাঁদের কেউ কেউ বিভিন্ন ফাঁকফোকর গলে আবারও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ঢুকে পড়েছিলেন বলে অভিযোগ।
ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ায় তাঁদের আবারও চিহ্নিত করা হয়েছে। কমিশন সূত্রের দাবি, অতীতের সমস্ত তথ্য মিলিয়ে দেখেই এই নামগুলি বাদ দেওয়া হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে একই ধরনের অনিয়ম আর না ঘটে।

ইন্টারভিউ প্রক্রিয়া নিয়ে সময় চাইছে এসএসসি
এই ব্যাপক ভেরিফিকেশন ও যাচাইয়ের কারণে এসএসসি নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষক নিয়োগের ইন্টারভিউ প্রক্রিয়া নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে শেষ করতে পারবে না বলে জানিয়েছে। কমিশন ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে আগামী বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় প্রয়োজন।
অন্যদিকে, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত ইন্টারভিউ প্রক্রিয়া এখনও চলছে। এসএসসি সূত্রে খবর, এই ইন্টারভিউ পর্ব ডিসেম্বর মাসের শেষ নাগাদ শেষ হওয়ার কথা।
কমিশনের কড়া বার্তা
এসএসসি আগেই প্রার্থীদের সতর্ক করেছিল, কোনও ভুল বা ভুয়ো তথ্য জমা দিলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেই সতর্কবার্তার পরও এত বড় সংখ্যায় অযোগ্য প্রার্থী ধরা পড়ায় প্রশ্ন উঠছে—দুর্নীতির শিকড় কতটা গভীরে?
কমিশনের তরফে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, যাঁদের নাম বাতিল করা হয়েছে, তাঁরা কোনওভাবেই ভবিষ্যতে এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারবেন না। সেই তালিকাও এসএসসি-র অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে, যাতে স্বচ্ছতা বজায় থাকে।
ফলপ্রকাশের পর অভিযোগ, তদন্তে নতুন মোড়
উল্লেখযোগ্যভাবে, ফলপ্রকাশের পরেই একাধিক মহল থেকে অভিযোগ উঠেছিল—অনেক ‘দাগি’ প্রার্থীও ভেরিফিকেশনের ডাক পাচ্ছেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই তথ্য যাচাই আরও কঠোর করা হয়। তারই ফল হিসেবে এই ১৩২৭ জন অযোগ্য প্রার্থীর নাম প্রকাশ্যে আসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা প্রমাণ করে যে নিয়োগ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফেরাতে কঠোর নজরদারি কতটা জরুরি। একদিকে যেমন এতে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীদের অধিকার রক্ষা হবে, তেমনই অন্যদিকে দুর্নীতির সঙ্গে যুক্তদের ছেঁটে ফেলা সম্ভব হবে।
একসময় শিক্ষকতার মতো সম্মানজনক পেশায় নিয়োগ মানেই ছিল মেধা ও যোগ্যতার স্বীকৃতি। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সেই বিশ্বাসে বড়সড় ধাক্কা লেগেছে। তবে ১৩২৭ জন অযোগ্য প্রার্থীকে বাদ দেওয়ার ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে—দীর্ঘ দেরির পর হলেও নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করার চেষ্টা চলছে।
এখন দেখার, এই উদ্যোগ কতটা সফল হয় এবং ভবিষ্যতে এমন অনিয়ম পুরোপুরি রোধ করা যায় কি না।



