আজকের দিনে WiFi ছাড়া জীবন প্রায় অচল। পড়াশোনা, অফিসের কাজ, বিনোদন—সব কিছুর জন্যই আমরা ইন্টারনেটের উপর নির্ভরশীল। সেই কারণেই অনেক বাড়িতে ওয়াইফাই রাউটার সারাদিন তো বটেই, সারা রাতও চালু থাকে। কিন্তু আপনি কি জানেন, রাতে WiFi বন্ধ না করে ঘুমানো আপনার শরীর ও মনের উপর নীরবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে?
বেশিরভাগ মানুষই মনে করেন, WiFi তো কেবল ইন্টারনেট দেয়—এতে আবার ক্ষতি কী? অথচ বাস্তব বলছে অন্য কথা। প্রতিদিনের এই ছোট অভ্যাস ভবিষ্যতে বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সারারাত WiFi চালু থাকলে কী ধরনের ঝুঁকি থাকতে পারে?
WiFi রাউটার থেকে নির্গত হয় তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ (Electromagnetic Radiation)। যদিও এই বিকিরণ মোবাইল টাওয়ারের মতো শক্তিশালী নয়, তবুও দীর্ঘ সময় ধরে শরীরের খুব কাছে থাকলে এর প্রভাব নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, রাতভর রাউটার চালু থাকলে ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। কারণ, এই তরঙ্গ মস্তিষ্কের উপর সূক্ষ্ম প্রভাব ফেলে, যা গভীর ঘুমে সমস্যা তৈরি করতে পারে।

ঘুমের সমস্যা ও অনিদ্রার ঝুঁকি
রাতে ভাল ঘুম না হলে তার প্রভাব পড়ে সারাদিনে। অনেকেই বুঝতে পারেন না কেন ঠিকমতো ঘুম হচ্ছে না, কেন বারবার ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমানোর ঘরে WiFi রাউটার চালু থাকলে অনিদ্রা, অস্থিরতা ও ক্লান্তিভাব বাড়তে পারে।
বিশেষ করে যারা রাউটারের কাছাকাছি বা মাথার পাশে মোবাইল রেখে ঘুমান, তাঁদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে ‘স্লিপিং ডিসঅর্ডার’ তৈরি হতে পারে।
মাথাব্যথা, মাইগ্রেন ও মানসিক অস্বস্তি
অনেকের ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, সারারাত ইলেকট্রনিক ডিভাইসের সংস্পর্শে থাকলে সকালে উঠে মাথাব্যথা, ভারী লাগা বা মনোযোগের অভাব দেখা দেয়। স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি মাইগ্রেনের সমস্যাও বাড়িয়ে দিতে পারে।
রাউটার চালু রেখে ঘুমানো সরাসরি রোগ সৃষ্টি না করলেও, শরীরের স্বাভাবিক বিশ্রামের প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর।
চোখের উপর মারাত্মক প্রভাব
WiFi নিজে চোখের ক্ষতি না করলেও, এর সঙ্গে যুক্ত একটি বড় সমস্যা হল—রাতভর মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহার। নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট থাকলে অনেকেই গভীর রাত পর্যন্ত স্ক্রিনে চোখ রেখে থাকেন।
এর ফলে—
- চোখ শুষ্ক হয়ে যাওয়া
- চোখে জ্বালা ও জল পড়া
- রেটিনার ক্ষতি
- চোখে ঝাপসা দেখা
এই সমস্যাগুলি ক্রমশ বাড়তে থাকে। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, নীল আলো (Blue Light) চোখের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার আশঙ্কা
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দিনে-রাতে দীর্ঘ সময় মোবাইল ও ল্যাপটপে ডুবে থাকেন, তাঁদের স্মৃতিশক্তি ধীরে ধীরে দুর্বল হতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া এবং মস্তিষ্কের বিশ্রামের অভাব এর অন্যতম কারণ।
দীর্ঘদিন এই অভ্যাস চলতে থাকলে ভবিষ্যতে মানসিক অবসাদ, মনোযোগের ঘাটতি এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে।

ক্যানসারের ঝুঁকি নিয়ে কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
এই বিষয়ে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে সতর্ক থাকা জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) আগেই জানিয়েছে, দীর্ঘ সময় তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গের সংস্পর্শে থাকার প্রভাব নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে।
কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, সরাসরি ক্যানসারের কারণ প্রমাণিত না হলেও, অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় এক্সপোজার এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ। তাই রাতে ব্যবহার না থাকলে WiFi বন্ধ রাখা একটি ভালো অভ্যাস।
কী করলে নিরাপদ থাকবেন?
✔ রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে WiFi রাউটার বন্ধ করুন
✔ ঘুমের ঘরে রাউটার না রাখাই ভালো
✔ মাথার কাছে মোবাইল রেখে ঘুমাবেন না
✔ প্রয়োজন না থাকলে ইন্টারনেট বন্ধ রাখুন
✔ স্ক্রিন টাইম কমান এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন
সচেতন অভ্যাসই সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি
WiFi আমাদের জীবন সহজ করেছে, এতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রযুক্তির সুবিধা নিতে গিয়ে যদি নিজের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করি, তাহলে সেই সুবিধাই অভিশাপে পরিণত হতে পারে।
তাই আজ থেকেই ছোট অভ্যাস বদলান। রাতে WiFi অফ করে নিশ্চিন্ত ঘুমান, সুস্থ থাকুন।



