Thursday, January 15, 2026
Google search engine
Homeরাজ্যপাটগাইঘাটায় বাংলাদেশি মহিলার মৃতদেহ শ্মশান থেকে ফিরল বাড়িতে, আটকাল সৎকার !

গাইঘাটায় বাংলাদেশি মহিলার মৃতদেহ শ্মশান থেকে ফিরল বাড়িতে, আটকাল সৎকার !

চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ থেকে ভারতে এসে শেষ পর্যন্ত জীবনযুদ্ধে হার মানলেন এক বাংলাদেশি মহিলা। কিন্তু মৃত্যুর পরও জটিলতায় পড়ল তাঁর পরিবার। বাংলাদেশ হাইকমিশনের অনুমতি না থাকায় বনগাঁ মহকুমা শ্মশান থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হলো মৃতদেহ, ঘটনাকে ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটা এলাকায়।

মৃত মহিলার নাম শেফালি বিশ্বাস (৬০)। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। উন্নত চিকিৎসার আশায় কয়েক মাস আগে বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসেন তিনি। চিকিৎসাকালীন সময়ে তিনি উত্তর ২৪ পরগনার সাঁইপুর (সাইপুর/সায়িপুর) এলাকায় আত্মীয়দের বাড়িতে থাকছিলেন। সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন শেফালি বিশ্বাস।


চিকিৎসার আশায় ভারতে আসা, কিন্তু মৃত্যু নিয়ে জটিলতা

পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, শেফালি বিশ্বাস বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসা নিয়ে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ভারতে এসেছিলেন। প্রথমে কলকাতার একাধিক হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা চলছিল। পরবর্তীতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তিনি আত্মীয়দের বাড়িতেই ছিলেন। সেখানেই ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়।

মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যরা নিয়মমাফিক শেষকৃত্যের প্রস্তুতি নেন। সোমবার তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় বনগাঁ মহকুমা শ্মশানে। সমস্ত ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী শেষকৃত্যের কাজকর্মও শুরু হয়ে যায়।


শ্মশানে পৌঁছেই বাধা, প্রকাশ্যে আসে নাগরিকত্বের বিষয়

তবে শেষকৃত্যের প্রস্তুতির মাঝেই সমস্যার সূত্রপাত। শ্মশান কর্তৃপক্ষ নিয়ম অনুযায়ী মৃতার কাগজপত্র যাচাই করতে গিয়ে দেখতে পান, তিনি ভারতীয় নাগরিক নন, বরং বাংলাদেশের নাগরিক। বিষয়টি সামনে আসতেই দাহকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

শ্মশান কর্তৃপক্ষ মৃতার পরিবারকে জানায়, বিদেশি নাগরিকের মৃতদেহ ভারতে দাহ করতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশের হাইকমিশনের অনুমতি বাধ্যতামূলক। বিশেষ করে বাংলাদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ হাইকমিশনের ছাড়পত্র বা ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ ছাড়া দাহ করা যায় না।


কেন প্রয়োজন হাইকমিশনের অনুমতি?

শ্মশান কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়, বিদেশি নাগরিকের মৃত্যু হলে সাধারণত কয়েকটি আইনি প্রক্রিয়া মানতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে—

  • মৃত ব্যক্তির পাসপোর্ট বাতিল সংক্রান্ত নথি
  • সংশ্লিষ্ট দেশের হাইকমিশনের লিখিত অনুমতি
  • স্থানীয় প্রশাসনের রিপোর্ট
  • মৃত্যুর কারণ সংক্রান্ত চিকিৎসকের সার্টিফিকেট

এই সমস্ত নথি একত্রে না থাকলে, বিদেশি নাগরিকের মৃতদেহ দাহ বা সৎকারের অনুমতি দেওয়া যায় না। শেফালি বিশ্বাসের পরিবারের কাছে সেই মুহূর্তে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কোনও অনুমতিপত্র না থাকায় শ্মশান কর্তৃপক্ষ দাহের অনুমতি দেয়নি।


শ্মশান থেকে ফেরত মৃতদেহ, বাড়িতে ফেরানো হলো

হঠাৎ এই সিদ্ধান্তে হতবাক হয়ে পড়েন মৃতার পরিবার ও পরিজনেরা। শেষ পর্যন্ত মরদেহ শ্মশান থেকে ফের নিয়ে যেতে বাধ্য হন তাঁরা। দেহ ফিরিয়ে আনা হয় গাইঘাটার সাঁইপুর এলাকার সেই বাড়িতে, যেখানে চিকিৎসার সময় তিনি থাকতেন।

শ্মশান কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, বাংলাদেশ হাইকমিশনের যথাযথ অনুমতি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে এলে তবেই ভবিষ্যতে দাহকাজ সম্পন্ন করা হবে। এর আগে কোনওভাবেই সৎকার সম্ভব নয়।


পরিবারে শোকের পাশাপাশি মানসিক চাপ

একদিকে প্রিয়জনকে হারানোর শোক, অন্যদিকে প্রশাসনিক জটিলতা—সব মিলিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন মৃতার পরিবার। তাঁদের বক্তব্য, বিদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে এই ধরনের নিয়ম রয়েছে তা জানা ছিল না। চিকিৎসার সময় সব নথিপত্র ঠিক থাকলেও, মৃত্যুর পরে যে হাইকমিশনের অনুমতি লাগবে, সে বিষয়ে কোনও স্পষ্ট ধারণা ছিল না।

পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করে যত দ্রুত সম্ভব অনুমতি নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।


প্রশাসনের বার্তা

প্রশাসনিক মহল জানাচ্ছে, এটি নতুন কোনও নিয়ম নয়। বিদেশি নাগরিকের মৃত্যু হলে আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী কাজ করতেই হয়। এতে শ্মশান কর্তৃপক্ষের কোনও গাফিলতি নেই। বরং আইন মেনেই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে।


এই ঘটনাটি আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, চিকিৎসার জন্য বিদেশ থেকে ভারতে আসা রোগীদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর পর আইনি প্রক্রিয়া কতটা জটিল হতে পারে। একদিকে মানবিক দিক, অন্যদিকে আইনি বাধ্যবাধকতা—এই দুইয়ের মাঝেই আটকে পড়েছে শেফালি বিশ্বাসের পরিবার।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments