ভোটার তালিকার খসড়া প্রকাশ হতেই রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে চাঞ্চল্য। শুধু তৃণমূল কংগ্রেস নয়, SIR (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়া কার্যত শাসক-বিরোধী সব রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যেই অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খসড়া তালিকায় লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়ার খবর সামনে আসতেই বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার কপালে চিন্তার ভাঁজ। এই তালিকায় অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষের নিজের বুথে বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ যাওয়া।
খসড়া তালিকায় রাজ্যজুড়ে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ
নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত খসড়া ভোটার তালিকা অনুযায়ী, গোটা রাজ্যজুড়ে মোট ৫৮ লক্ষ ২০ হাজার ৮৯৮ জন ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। এই বিপুল সংখ্যার মধ্যে রয়েছেন মৃত ভোটার, স্থায়ীভাবে অন্যত্র চলে যাওয়া ভোটার, নো-ম্যাপিং কেস, অনুপস্থিত ভোটার এবং ডুপ্লিকেট নাম। কমিশনের দাবি, তালিকা পরিশুদ্ধ করতেই এই পদক্ষেপ।
তবে রাজনৈতিক মহলের মতে, এই প্রক্রিয়া বহু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমীকরণে বড়সড় প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ ভোটার তালিকা থেকেই নির্বাচনের ভিত্তি তৈরি হয়।

দিলীপ ঘোষের বুথে কেন এত ভোটার বাদ?
বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি ও প্রাক্তন সাংসদ দিলীপ ঘোষ বর্তমানে খড়গপুর শহরের রেলনগরী এলাকার ২৬৩ নম্বর বুথের ভোটার। আগে কলকাতা থেকে ভোটার হলেও, অনেক আগেই তিনি খড়গপুরে নিজের নাম স্থানান্তর করেন।
এই বুথেই SIR প্রক্রিয়ার আওতায় মোট ২৩৫ জন ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, যা রাজ্যের হেভিওয়েট নেতাদের বুথগুলির মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ।
কমিশনের নথি অনুযায়ী, এই ২৩৫ জনের মধ্যে—
- মৃত ভোটার: ১৯ জন
- স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত: ১১ জন
- নো-ম্যাপিং কেস: ৭৬ জন
- অনুপস্থিত ভোটার: ১৯৬ জন
এই পরিসংখ্যান সামনে আসতেই রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
ভোটার সংখ্যা এক ধাক্কায় কমে গেল কেন?
SIR-এর আগে দিলীপ ঘোষের ওই বুথে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ৭৭৯ জন। খসড়া তালিকা প্রকাশের পর সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৭২ জনে। অর্থাৎ এক লাফে প্রায় ৩০০ ভোটার কমে গিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অন্যতম প্রধান কারণ ওই এলাকা একটি রেলকলোনি অধ্যুষিত অঞ্চল। চাকরির সূত্রে বহু মানুষ এখানে এসে থাকেন, আবার বদলি বা অবসরজনিত কারণে অন্যত্র চলে যান। ফলে স্থায়ী ভোটারের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
তবুও প্রশ্ন উঠছে—এত বড় সংখ্যায় ভোটার বাদ পড়া কি শুধুই প্রশাসনিক কারণে, নাকি আরও গভীর কোনও সমস্যা রয়েছে?

অন্যান্য হেভিওয়েট নেতাদের বুথে কী পরিস্থিতি?
দিলীপ ঘোষের বুথে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়লেও, রাজ্যের অন্যান্য প্রভাবশালী নেতাদের বুথে চিত্র তুলনামূলকভাবে ভিন্ন।
- মানস ভুঁইয়া: তাঁর ১০ নম্বর বুথে বাদ পড়েছে মাত্র ২১ জনের নাম।
- শ্রীকান্ত মাহাতো: শালবনীর ৩০৮ নম্বর বুথের ভোটার। সেখানে বাদ গিয়েছে ১৮ জন।
- সুজয় হাজরা: মেদিনীপুর শহরের ২১১ নম্বর বুথে তাঁর ভোট। সেখানেও নাম বাদ পড়ার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে সীমিত।
এই তুলনা সামনে আসতেই দিলীপ ঘোষের বুথ নিয়ে আলোচনা আরও তীব্র হয়েছে।
কমিশনের ব্যাখ্যা ও পরিসংখ্যান
নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যাঁদের নাম খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাঁদের শ্রেণিবিভাগ এমন—
- নিখোঁজ ভোটার: ১২ লক্ষ ২০ হাজার ৩৮ জন
- অনুপস্থিত ভোটার: ১৯ লক্ষ ৮৮ হাজার ৭৬ জন
- মৃত ভোটার: ২৪ লক্ষ ১৬ হাজার ৮৫২ জন
- ডুপ্লিকেট ভোটার: ১ লক্ষ ৩৮ হাজার জন
কমিশনের দাবি, এই প্রক্রিয়া এখনও চূড়ান্ত নয়। অভিযোগ, আপত্তি ও শুনানির পর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হবে।
রাজনৈতিক উদ্বেগ বাড়ছে কেন?
রাজনৈতিক মহলের মতে, খসড়া তালিকায় নাম বাদ পড়া মানেই চূড়ান্ত তালিকায় নাম থাকবে না—এমন নয়। তবে এত বড় সংখ্যায় ভোটার বাদ যাওয়া রাজনৈতিক দলগুলিকে স্বাভাবিকভাবেই চিন্তায় ফেলছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় ভোটের ফলাফল খুব কম ব্যবধানে নির্ধারিত হয়, সেখানে এই ধরনের পরিবর্তন বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
দিলীপ ঘোষের বুথের ঘটনা সেই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ এটি শুধু একজন সাধারণ ভোটারের বিষয় নয়, বরং একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার নিজের এলাকার চিত্র।



