ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ছাই হয়ে গেল নিউটাউনের ঘুনি বস্তি। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় লাগা এই আগুনে মুহূর্তের মধ্যে ভস্মীভূত হয়ে যায় অসংখ্য অস্থায়ী ঝুপড়ি ঘর। শুক্রবার সকাল হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়। এখনও একাধিক জায়গায় জ্বলছে আগুনের আঁচ, উঠছে কালো ধোঁয়া। আগুন সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে আজ সকাল থেকেই ঘটনাস্থলে মোতায়েন রয়েছে দমকলের পাঁচটি ইঞ্জিন।
সন্ধ্যায় শুরু, রাতভর যুদ্ধকালীন তৎপরতা
স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য অনুযায়ী, গতকাল সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টা ৩০ মিনিট নাগাদ ঘুনি বস্তির একটি অংশে হঠাৎ আগুন লাগে। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের ঝুপড়িগুলিতে। এলাকায় অধিকাংশ বাড়িই ছিল অস্থায়ী, টিন, প্লাস্টিক, কাঠ এবং দাহ্য সামগ্রী দিয়ে তৈরি। তার উপর দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টির অভাব এবং শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
খবর পেয়ে প্রথমে কয়েকটি দমকল ইঞ্জিন ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে পরে ২০ থেকে ২৫টি দমকল ইঞ্জিন নামানো হয়। গোটা রাত ধরে দমকলকর্মীরা যুদ্ধকালীন তৎপরতায় আগুন নেভানোর চেষ্টা চালান।
আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও রয়ে গেছে পকেট ফায়ার
দমকল সূত্রে জানা গেছে, রাতের মধ্যেই আগুনের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও বস্তির ভেতরের কিছু জায়গায় এখনও পকেট ফায়ার রয়ে গেছে। সেই কারণেই আজ সকাল থেকে আবারও দমকলের পাঁচটি ইঞ্জিন ঘটনাস্থলে কাজ করছে।
বর্তমানে চলছে কুলিং ডাউন প্রসেস, যাতে নতুন করে আগুন ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা যায়। দমকলকর্মীরা প্রতিটি ধ্বংসস্তূপ খুঁটিয়ে পরীক্ষা করছেন এবং জল ছিটিয়ে আগুনের অবশিষ্ট আঁচ নিভিয়ে দেওয়ার কাজ চলছে।

সকালেও কালো ধোঁয়ায় ঢেকে এলাকা
শুক্রবার সকালবেলায় ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, যতদূর চোখ যায় শুধুই ছাই আর ধ্বংসস্তূপ। বাতাসে এখনও পোড়া গন্ধ। অনেক জায়গা থেকে উঠছে কালো ধোঁয়া। আগুনে পুড়ে যাওয়া ঝুপড়ির কাঠামো ভেঙে পড়ে রয়েছে। রাস্তাঘাটে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ঘরের জিনিসপত্র—পোড়া বাসন, কাপড়, নথিপত্র।
স্থানীয়দের একাংশ জানিয়েছেন, রাতের অন্ধকারে প্রাণ বাঁচাতে তারা ঘর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। অনেকেই শুধু গায়ের কাপড়টুকু নিয়েই বেরোতে পেরেছেন।
ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও স্পষ্ট নয়
এই অগ্নিকাণ্ডে ঠিক কতগুলি ঝুপড়ি পুড়ে গেছে, কত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত—তা এখনও নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব হয়নি। তবে স্থানীয় সূত্রের দাবি, শতাধিক পরিবার কার্যত সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে।
ভাগ্যক্রমে এখন পর্যন্ত কোনও প্রাণহানির খবর মেলেনি, যদিও কয়েকজন ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে জানা গেছে। তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
আগুন লাগার কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা
আগুন লাগার সঠিক কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হচ্ছে—
- শর্ট সার্কিট
- খোলা আগুন থেকে দুর্ঘটনা
- রান্নার সময় অসাবধানতা
এই যে কোনও একটি কারণ থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে দমকল ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগুন লাগার কারণ নিয়ে নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না।
প্রশাসনের ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ আশঙ্কা
ঘটনাস্থলে দমকলের পাশাপাশি পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের আধিকারিকরাও উপস্থিত রয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য অস্থায়ী আশ্রয় ও ত্রাণের ব্যবস্থা করা হবে কিনা, সে বিষয়ে প্রশাসনের তরফে আলোচনা চলছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এত বড় বস্তি এলাকায় অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। পর্যাপ্ত জল সরবরাহ, আগুন নেভানোর সরঞ্জাম বা নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগের অভাব দীর্ঘদিন ধরেই ছিল।
এই ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলে দিল শহরের প্রান্তিক বস্তি এলাকাগুলির অগ্নি-নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা নিয়ে।



