ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে এক বড় ধাক্কা। এশিয়ার মঞ্চে দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ক্লাব মোহনবাগান সুপার জায়ান্টকে (Mohun Bagan SG) দুই বছরের জন্য নির্বাসিত করল এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (AFC)। শুধু নিষেধাজ্ঞাই নয়, সঙ্গে চাপানো হয়েছে ১ লক্ষ ৭২৯ মার্কিন ডলারের জরিমানা, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৯১ লক্ষ টাকারও বেশি। সবুজ-মেরুন শিবিরের উপর এই শাস্তি কার্যকর থাকবে ২০২৭-২৮ মরসুম পর্যন্ত।
এই সিদ্ধান্ত সামনে আসতেই ভারতীয় ফুটবল মহলে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। সমর্থকদের একাংশ যেমন হতবাক, তেমনই অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—ফুটবলারদের নিরাপত্তার কথা ভেবে নেওয়া সিদ্ধান্তের ফল এতটা কঠোর হওয়া কি ন্যায্য?
কেন এত বড় শাস্তি পেল মোহনবাগান?
মূলত একটি সিদ্ধান্ত থেকেই এই বিপর্যয়। গত সেপ্টেম্বর মাসে ইরানের সেপাহান এসসি-র বিরুদ্ধে AFC Champions League Two-র গ্রুপ পর্বের ম্যাচ খেলতে ইরানে যেতে অস্বীকার করে মোহনবাগান। ক্লাব কর্তৃপক্ষের দাবি ছিল, ইরানে সেই সময়কার যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি, নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কা এবং ভিসা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে ফুটবলার ও সাপোর্ট স্টাফদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এই কারণ দেখিয়ে মোহনবাগান AFC-র কাছে আবেদন করেছিল, ম্যাচটি যেন নিরপেক্ষ কোনো দেশে আয়োজন করা হয়। কিন্তু AFC সেই আবেদন খারিজ করে দেয়। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী দল না পাঠানোয়, নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগে বিষয়টি যায় AFC-র Disciplinary and Ethics Committee-র কাছে।

এএফসি কী সিদ্ধান্ত নিল?
দীর্ঘ শুনানির পর ১৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বৈঠকে AFC-র শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা কমিটি সিদ্ধান্ত নেয়—
- মোহনবাগান SG-কে ২০২৭-২৮ মরসুম পর্যন্ত সব ধরনের AFC প্রতিযোগিতা থেকে নিষিদ্ধ করা হবে
- ক্লাবকে দিতে হবে ১,৭২৯ ডলার জরিমানা
- এই জরিমানার মধ্যে ধরা হয়েছে AFC এবং প্রতিপক্ষ সেপাহান ক্লাবের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ
এএফসি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, কোনো ক্লাব নির্ধারিত ম্যাচে অংশ না নিলে, এমনকি নিরাপত্তাজনিত যুক্তি থাকলেও, কনফেডারেশনের অনুমতি ছাড়া সূচি ভঙ্গ করা গুরুতর অপরাধ।
আগে কী শাস্তি আশা করা হচ্ছিল?
প্রাথমিকভাবে AFC ইঙ্গিত দিয়েছিল, চলতি মরসুমে মোহনবাগানের অর্জিত সব পয়েন্ট কেটে নেওয়া হবে। কিন্তু ফুটবল বিশেষজ্ঞরা আগেই আশঙ্কা করেছিলেন, বিষয়টি এখানেই থামবে না। বুধবারের ঘোষণায় সেই আশঙ্কাই সত্যি হল। দুই বছরের নিষেধাজ্ঞা মানে, আগামী দু’মরসুমে আইএসএল চ্যাম্পিয়ন হলেও এশিয়ার মঞ্চে খেলার সুযোগ থাকবে না সবুজ-মেরুনের।
মোহনবাগানের প্রতিক্রিয়া কী?
এখনও পর্যন্ত মোহনবাগান কর্তৃপক্ষের তরফে সরকারি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি। তবে ক্লাব সূত্রে জানা গিয়েছে, এই শাস্তির বিরুদ্ধে এপিল বা আবেদন জানাবে মোহনবাগান। আইনি পথে AFC-র সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করার প্রস্তুতি চলছে। তবে এই আবেদন আদৌ কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে ফুটবল মহলে।

ফুটবলারদের নিরাপত্তা বনাম নিয়ম—কোথায় দাঁড়াল বিতর্ক?
এই ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি বড় প্রশ্ন—
ফুটবলারদের নিরাপত্তা কি নিয়মের ঊর্ধ্বে, নাকি নিয়মই শেষ কথা?
মোহনবাগানের সমর্থকদের দাবি, যুদ্ধ পরিস্থিতি থাকা সত্ত্বেও ইরানে দল পাঠানো মানে খেলোয়াড়দের জীবন নিয়ে ঝুঁকি নেওয়া। অন্যদিকে AFC-র যুক্তি, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী ক্লাবগুলোকে নির্ধারিত নিয়ম মানতেই হবে।
এই দ্বন্দ্বই আজ সবুজ-মেরুনকে এনে ফেলেছে বড়সড় সমস্যায়।
ভারতীয় ফুটবলের জন্য এর প্রভাব কী?
এই নিষেধাজ্ঞা শুধু মোহনবাগানের নয়, ভারতীয় ক্লাব ফুটবলের জন্যও বড় ধাক্কা। AFC মঞ্চে ভারতের প্রতিনিধিত্ব কমে যাবে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, র্যাঙ্কিং এবং স্পনসরশিপের ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়তে পারে।
মোহনবাগানের উপর চাপানো এই শাস্তি নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক ও বিতর্কিত। ফুটবলারদের নিরাপত্তার কথা ভেবে নেওয়া সিদ্ধান্তই আজ ক্লাবকে এনে দাঁড় করিয়েছে এশিয়ার দরজার বাইরে। এখন দেখার, আপিল প্রক্রিয়ায় সবুজ-মেরুন কতটা স্বস্তি আদায় করতে পারে।



