বছরের পর বছর পরিশ্রম করে জমানো অর্থ এক মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে যেতে পারে—এ কথা এখন আর কেবল ভয়ের গল্প নয়, বরং বাস্তব অভিজ্ঞতা। সাম্প্রতিক সময়ে সাইবার অপরাধীরা এমন এক নতুন প্রতারণা পদ্ধতি ব্যবহার করছে, যেখানে ওটিপি, এটিএম পিন বা ব্যাঙ্ক কল ছাড়াই সাধারণ মানুষের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নতুন ধরনের ডিজিটাল জালিয়াতি আগের তুলনায় অনেক বেশি বিপজ্জনক। কারণ এখানে ভুক্তভোগী অনেক সময় বুঝতেই পারেন না কীভাবে তাঁর অ্যাকাউন্টে অনুপ্রবেশ ঘটল।
কীভাবে ওটিপি ছাড়াই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট হ্যাক হচ্ছে?
এই প্রতারণার মূল অস্ত্র হল ভুয়ো মেসেজ ও ক্ষতিকর লিংক। প্রতারকরা এমন বার্তা পাঠাচ্ছে, যা দেখতে হুবহু ব্যাঙ্ক, সরকারি সংস্থা বা নামী কোম্পানির অফিসিয়াল মেসেজের মতো। বার্তায় লেখা থাকে—
- আপনার KYC আপডেট করা প্রয়োজন
- অ্যাকাউন্ট ব্লক হয়ে যাবে
- বিশেষ ক্যাশব্যাক বা পুরস্কার জিতেছেন
- পেমেন্ট ব্যর্থ হয়েছে, পুনরায় যাচাই করুন
এই বার্তায় থাকা একটি লিংকে ক্লিক করলেই বিপদ শুরু।
লিংকটি খোলার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবহারকারীর মোবাইলে থাকা সংবেদনশীল তথ্য—যেমন ব্যাঙ্ক অ্যাপ অ্যাক্সেস, কুকি ডেটা, স্ক্রিন পারমিশন বা কী-লগিং তথ্য—চুপিসারে হ্যাকারদের হাতে চলে যায়। এরপর তারা রিমোট অ্যাক্সেস বা ম্যালওয়্যার ব্যবহার করে সরাসরি অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে নেয়, কোনো ওটিপির প্রয়োজন ছাড়াই।

আপনার নম্বর ও তথ্য পেল কোথা থেকে?
অনেকেই ভাবেন, “আমার নম্বর ও ইমেইল ওরা পেল কীভাবে?”
বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী—
- অনলাইন শপিং সাইট
- সোশ্যাল মিডিয়া
- ফ্রি অ্যাপ বা কুইজ
- অনিরাপদ ওয়েবসাইট
এই সব জায়গায় মানুষ অজান্তেই নিজের ফোন নম্বর, ইমেইল আইডি বা ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করে ফেলেন। সেই তথ্যই পরে ব্যবহার করা হয় টার্গেটেড প্রতারণার জন্য।
সতর্ক থাকবেন যেভাবে: জেনে নিন গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা পরামর্শ
🔴 ১. ক্রিপ্টোকারেন্সি স্কিম থেকে দূরে থাকুন
স্বল্প বিনিয়োগে বিপুল লাভ—এই প্রলোভনই সবচেয়ে বড় ফাঁদ। সোশ্যাল মিডিয়া বা মেসেজে আসা কোনো ক্রিপ্টো স্কিমে বিনিয়োগ করবেন না। এমনকি গুগ্লও অনলাইন ক্রিপ্টো স্কিম থেকে সাধারণ ব্যবহারকারীদের দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে।
🔴 ২. ভুয়ো অ্যাপ ইনস্টল করা মারাত্মক বিপজ্জনক
বর্তমানে প্লে স্টোর ও অ্যাপ স্টোরেও অনেক নকল অ্যাপ ঘুরে বেড়াচ্ছে।
অ্যাপ ইনস্টল করার আগে অবশ্যই দেখুন—
- ডেভেলপারের নাম
- রিভিউ ও রেটিং
- ডাউনলোড সংখ্যা
- অ্যাপটি কী কী পারমিশন চাইছে
কখনোই কোনো অ্যাপকে ব্যাঙ্ক তথ্য, ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড নম্বর বা OTP অ্যাক্সেস দেবেন না।

🔴 ৩. নকল ওয়েবসাইট চিনবেন কীভাবে?
যে কোনো ওয়েবসাইটে ঢোকার পর খেয়াল করুন—
- যোগাযোগের ঠিকানা ও ফোন নম্বর আছে কি না
- ডোমেন নামের বানান ঠিক আছে কি না
- URL-এ অদ্ভুত চিহ্ন, ইমোজি বা বানান ভুল আছে কি না
এই ধরনের লক্ষণ থাকলে বুঝবেন সেটি ভুয়ো ওয়েবসাইট।
🔴 ৪. অচেনা কল ও লিংক এড়িয়ে চলুন
হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার বা SMS-এ আসা অচেনা লিংক কখনোই যাচাই না করে খুলবেন না।
কেউ যদি ফোন করে—
- জমি
- লটারি
- সরকারি সাহায্য
- বড় অঙ্কের টাকার প্রলোভন
দেখিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য জানতে চায়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে কল কেটে দিন।
🔴 ৫. সন্দেহ হলেই দ্রুত ব্যবস্থা নিন
আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে গেলে বা সন্দেহজনক কিছু ঘটলে—
- সঙ্গে সঙ্গে ব্যাঙ্কে যোগাযোগ করুন
- কার্ড ও অ্যাকাউন্ট ব্লক করুন
- সাইবার ক্রাইম হেল্পলাইন 1930-এ অভিযোগ জানান
ডিজিটাল সুবিধার সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকিও বেড়েছে বহুগুণ। একটু অসতর্কতা মুহূর্তেই আপনাকে সর্বস্বান্ত করে দিতে পারে। তাই সচেতন থাকুন, সন্দেহপ্রবণ হন এবং কোনো লোভনীয় অফারে না পা দেওয়াই বুদ্ধিমানের।
মনে রাখবেন—আপনার এক ক্লিকই হ্যাকারদের সুযোগ করে দিতে পারে।



