বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার আবহে ঢাকার ঐতিহাসিক ঢাকেশ্বরী মন্দিরসহ একাধিক হিন্দু ধর্মীয় স্থাপনার নিরাপত্তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে ইউনুস নেতৃত্বাধীন প্রশাসন। প্রশাসনিক সূত্রের খবর, গোয়েন্দা বিভাগ থেকে আগাম সতর্কবার্তা পাওয়া গিয়েছে যে যে কোনো সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হিন্দু মন্দিরগুলিকে লক্ষ্য করে হামলার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সেই কারণেই ঢাকেশ্বরী মন্দিরকে ঘিরে কড়া নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে।
হিংসাত্মক ঘটনার পর থেকেই উত্তেজনা তুঙ্গে
সম্প্রতি ছাত্রনেতা ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশজুড়ে নতুন করে অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা সহ একাধিক শহরে বিক্ষোভ, অগ্নিসংযোগ এবং ভাঙচুরের ঘটনা সামনে এসেছে। যদিও ইতিমধ্যে ওসমান হাদিকে সমাহিত করা হয়েছে, তবে পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞের ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনা এখনও বহাল।
এই আবহেই আরও একটি হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। হিন্দু যুবক দীপু দাসের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। এই দুই ঘটনার জেরে প্রশাসনের উপর চাপ বাড়ে এবং সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির নিরাপত্তা নতুন করে পর্যালোচনা করা হয়।
ঢাকেশ্বরী মন্দির কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
ঢাকেশ্বরী মন্দির শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় স্থান নয়, এটি বাংলাদেশের জাতীয় মন্দির হিসেবেও স্বীকৃত। হিন্দু ধর্মে শক্তিপীঠগুলির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। পুরাণ মতে, মোট ৫১টি শক্তিপীঠ রয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটি ভারতের বাইরে অবস্থিত। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত ঢাকেশ্বরী দেবী মন্দির সেই শক্তিপীঠগুলির অন্যতম।
‘ঢাকেশ্বরী’ শব্দের অর্থ ‘ঢাকার দেবী’। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, ঢাকা শহরের নামকরণই হয়েছে ঢাকেশ্বরী দেবীর নাম অনুসারে। ফলে এই মন্দিরের সঙ্গে শুধুমাত্র ধর্মীয় নয়, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক আবেগও জড়িয়ে রয়েছে।

কড়া নিরাপত্তা জালে মুড়ে ফেলা হয়েছে মন্দির
বর্তমান পরিস্থিতিতে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে মোতায়েন করা হয়েছে সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী। মন্দির চত্বর, প্রবেশপথ এবং আশপাশের এলাকায় বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। সিসিটিভি ক্যামেরার সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং নিয়মিত টহল দিচ্ছে নিরাপত্তারক্ষীরা। প্রশাসনের দাবি, যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত বছরের জুলাই মাস থেকেই এই মন্দির চরমপন্থী সংগঠনগুলির হুমকির মুখে রয়েছে বলে বিভিন্ন মহল দাবি করে আসছে। একাধিকবার হুমকি বার্তার খবর সামনে আসায় মন্দির কর্তৃপক্ষও উদ্বিগ্ন।
সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
বাংলাদেশে চলমান অরাজক পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে দেশ-বিদেশে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় সবথেকে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলি। ঢাকেশ্বরী মন্দির সেই তালিকার শীর্ষে রয়েছে।
যদিও প্রশাসনের তরফে নিরাপত্তা জোরদারের কথা বলা হচ্ছে, তবুও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কাটেনি। অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, বড় ধরনের হামলা হলে শুধুমাত্র পুলিশি পাহারা পরিস্থিতি সামাল দিতে কতটা সক্ষম হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
নির্বাচন ঘনাতেই উত্তপ্ত বাংলাদেশ
এর মধ্যেই বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন এগিয়ে আসছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে। বিরোধী আন্দোলন, রাজনৈতিক হিংসা এবং সামাজিক বিভাজন—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যে আরও জটিল হতে পারে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এই প্রেক্ষাপটে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনার নিরাপত্তা প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঢাকেশ্বরী মন্দির শুধু একটি উপাসনালয় নয়, এটি বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের আস্থার প্রতীক। বর্তমান অস্থির সময়ে এই মন্দিরের নিরাপত্তা বৃদ্ধি প্রশাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হলেও, দীর্ঘমেয়াদে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত। এখন দেখার, ইউনুস সরকার পরিস্থিতি কতটা দক্ষতার সঙ্গে সামাল দিতে পারে এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলির কী উত্তর দেয়।



