Thursday, January 15, 2026
Google search engine
Homeরাজ্যপাটবাঘের সঙ্গে মুখোমুখি লড়াই, স্ত্রীকে বাঁচিয়ে ফিরলেন পাথরপ্রতিমার সুভাষ পাল

বাঘের সঙ্গে মুখোমুখি লড়াই, স্ত্রীকে বাঁচিয়ে ফিরলেন পাথরপ্রতিমার সুভাষ পাল

এ যেন রূপকথার গল্প নয়, বাস্তবের এক ভয়ংকর অথচ অনুপ্রেরণামূলক লড়াই। সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের সঙ্গে সম্মুখসমরে নেমে স্ত্রীকে বাঁচিয়ে ফিরলেন এক মৎস্যজীবী। দক্ষিণ ২৪ পরগনার পাথরপ্রতিমা ব্লকের বিজিয়াড়া জঙ্গলে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় শিউরে উঠেছে গোটা এলাকা। বাঘের কবল থেকে স্ত্রীকে ছিনিয়ে এনে প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন সুভাষ পাল (নায়েক) নামে ওই মৎস্যজীবী।

এই ঘটনা ফের সামনে এনে দিল সুন্দরবনে মানুষ ও বন্যপ্রাণের সংঘাতের ভয়াবহ বাস্তবতা।


কীভাবে ঘটল ভয়ংকর ঘটনাটি

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, পাথরপ্রতিমার গোবর্ধনপুর কোস্টাল থানার অন্তর্গত সত্যদাসপুর এলাকার বাসিন্দা শংকরি নায়েক ও তাঁর স্বামী সুভাষ নায়েক সহ মোট পাঁচজন মৎস্যজীবী নৌকাযোগে কাঁকড়া ধরতে গিয়েছিলেন কলস জঙ্গল সংলগ্ন বিজিয়াড়া এলাকায়। সুন্দরবনের এই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই বাঘ চলাচলের জন্য পরিচিত।

সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। হঠাৎই ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে একটি পূর্ণবয়স্ক রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। মুহূর্তের মধ্যেই সে শংকরি নায়েককে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে জঙ্গলের গভীরে। আচমকা এই আক্রমণে হতভম্ব হয়ে পড়েন সঙ্গে থাকা মৎস্যজীবীরা।


স্ত্রীকে বাঁচাতে বাঘের উপর ঝাঁপ স্বামীর

ঠিক সেই সময়েই ঘটে অবিশ্বাস্য ঘটনা। স্ত্রীকে বাঘের মুখে চলে যেতে দেখে কোনও কিছু না ভেবেই সুভাষ পাল বাঘের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। খালি হাতেই শুরু হয় মানুষ বনাম বাঘের লড়াই। সঙ্গে থাকা অন্য মৎস্যজীবীরাও লাঠি, নৌকার দাঁড়, যা পেয়েছেন তাই নিয়ে বাঘকে আঘাত করতে থাকেন।

দীর্ঘ কয়েক মিনিট নয়, প্রায় কয়েক ঘণ্টা ধরে চলে এই রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি। শেষ পর্যন্ত আহত অবস্থায় বাঘ রণে ভঙ্গ দিয়ে জঙ্গলের গভীরে পালিয়ে যায়। রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার হন শংকরি নায়েক এবং তাঁর স্বামী সুভাষ পাল।


হাসপাতালে চিকিৎসা, প্রাণে বাঁচা অলৌকিক বলেই মনে করছেন অনেকে

ঘটনার পর দ্রুত তাঁদের উদ্ধার করে প্রথমে মাধবনগর গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় দু’জনকেই কাকদ্বীপ মহকুমা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়।

চিকিৎসকদের মতে, বাঘের আক্রমণের পরেও দু’জনের প্রাণে বেঁচে যাওয়া কার্যত অলৌকিক। বিশেষ করে সুভাষ পালের সাহসিকতা না থাকলে এই ঘটনার পরিণতি যে আরও ভয়াবহ হতে পারত, তা স্বীকার করছেন সবাই।


এলাকাজুড়ে চাঞ্চল্য ও আতঙ্ক

এই ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই পাথরপ্রতিমা ও আশপাশের গ্রামগুলিতে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে। কারণ কয়েকদিন আগেই ওই এলাকায় বাঘ ঢোকার খবর পাওয়া গিয়েছিল। তখন বনদফতরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, বাঘটি ফের জঙ্গলে ফিরে গিয়েছে। কিন্তু এই ঘটনার পর সেই আশ্বাসে আর ভরসা রাখতে পারছেন না স্থানীয় মানুষজন।

মৎস্যজীবীদের দাবি, জীবিকার তাগিদে তাঁদের জঙ্গলে যেতে হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া এই কাজ করতে গিয়ে প্রতিদিনই মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হচ্ছে।


পুলিশের ভূমিকা ও তদন্ত

ঘটনার খবর পেয়ে গোবর্ধনপুর কোস্টাল থানায় জানানো হয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বনদফতরের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছে। ওই এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হবে বলে জানানো হয়েছে প্রশাসনের তরফে।


সুন্দরবনে মানুষ-বাঘ সংঘাত ফের প্রশ্নের মুখে

এই ঘটনা ফের প্রশ্ন তুলছে সুন্দরবনের মানুষ-বাঘ সংঘাত নিয়ে। একদিকে বন সংরক্ষণ, অন্যদিকে মানুষের জীবিকা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য কোথায়? স্থানীয়দের দাবি, কাঁকড়া ও মাছ ধরাই তাঁদের একমাত্র রুজির পথ। অথচ প্রতিবার জঙ্গলে ঢুকলেই প্রাণ হাতে নিয়ে যেতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বনাঞ্চলে আরও কার্যকর নজরদারি, নিরাপদ ফিশিং জোন এবং বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা না হলে এমন ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে।


সাহসের প্রতীক সুভাষ পাল

আজ পাথরপ্রতিমা থেকে সুন্দরবনের সর্বত্র একটাই নাম ঘুরছে—সুভাষ পাল। স্ত্রীকে বাঁচাতে বাঘের সামনে দাঁড়ানো এই মানুষটির সাহস ইতিমধ্যেই লোককথায় পরিণত হয়েছে। অনেকেই বলছেন, প্রকৃত লড়াই কাকে বলে, তা এই ঘটনাই দেখিয়ে দিল।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments