অমৃত মণ্ডল ওরফে সম্রাটের রহস্যজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যখন দেশজুড়ে তীব্র আলোচনা, জল্পনা ও বিতর্ক চলছে, ঠিক সেই সময়েই কৌশলী অবস্থান নিল ইউনুস সরকার। সামাজিক মাধ্যমে অমৃত মণ্ডলের মৃত্যুকে ঘিরে একের পর এক বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ তুলে বৃহস্পতিবার রাতে সরকারের পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি জারি করা হয়। সেই বিবৃতিতেই অমৃত মণ্ডলকে সরাসরি ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মহম্মদ ইউনুসের প্রেস উইং থেকে প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অমৃত মণ্ডল দীর্ঘদিন ধরেই অপরাধমূলক কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং চাঁদা আদায়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের উপর জুলুম চালাতেন। সরকারের দাবি অনুযায়ী, ঘটনার দিন অমৃত মণ্ডলের সঙ্গে তাঁর এক সহযোগীও উপস্থিত ছিলেন। চাঁদা তোলাকে কেন্দ্র করেই প্রথমে বচসা শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। শেষ পর্যন্ত জনতার ক্ষোভ গিয়ে পড়ে অমৃতের উপর, যার ফলেই তিনি প্রাণ হারান বলে দাবি প্রশাসনের।
‘খুন’ নয়, জনরোষে মৃত্যু—সরকারি ব্যাখ্যা
সরকারি বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, অমৃত মণ্ডলের মৃত্যু নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে ‘খুন’ শব্দটি ব্যবহার করে পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করার চেষ্টা চলছে। প্রশাসনের বক্তব্য, এটি একটি দুঃখজনক ঘটনা হলেও, একে পরিকল্পিত খুন বা সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হিসেবে দেখানোর কোনও ভিত্তি নেই। বরং দীর্ঘদিনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ফলেই সাধারণ মানুষের ক্ষোভ চরমে পৌঁছেছিল।
প্রেস উইংয়ের দাবি অনুযায়ী, অমৃত মণ্ডলের বিরুদ্ধে ২০২৩ সাল থেকেই একাধিক গুরুতর মামলা চলছিল। তার মধ্যে খুন, চাঁদাবাজি, ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় এবং সন্ত্রাসমূলক কার্যকলাপের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে বিবৃতিতে।
গণপিটুনির নিন্দা, তবুও ‘অপরাধী’ তকমা
যদিও সরকার অমৃত মণ্ডলকে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তবুও তার মৃত্যুকে সমর্থন করা হয়নি। বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, গণপিটুনি কোনওভাবেই আইনের চোখে গ্রহণযোগ্য নয়। এটি সম্পূর্ণ আইন বহির্ভূত কাজ এবং সভ্য সমাজে এমন ঘটনার কোনও স্থান নেই।
সরকার জানিয়েছে, এই ঘটনার সঙ্গে যাঁরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত, তাঁদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যেই তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং ঘটনার প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সাম্প্রদায়িক রং দেওয়ার অভিযোগে কড়া হুঁশিয়ারি
ইউনুস সরকারের বিবৃতিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। দাবি করা হয়েছে, কিছু মহল ইচ্ছাকৃতভাবে এই ঘটনাকে সাম্প্রদায়িকতার রং দেওয়ার চেষ্টা করছে এবং সমাজে বিভাজন তৈরি করতে চাইছে। সরকার এই প্রবণতাকে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে উল্লেখ করেছে।
বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, যারা সোশাল মিডিয়ায় ভুয়ো খবর, উসকানিমূলক পোস্ট বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে ডিজিটাল নজরদারি আরও বাড়ানো হবে বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
সেফ গেম না দায় এড়ানোর চেষ্টা—প্রশ্ন উঠছে
রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, এই বিবৃতি কি আদতে একটি ‘সেফ গেম’? অমৃত মণ্ডলের মৃত্যুকে ঘিরে যখন সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক প্রশ্ন উঠছে, ঠিক তখনই তাঁকে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ তকমা দিয়ে নিজেদের অবস্থান মজবুত করার চেষ্টা করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক চলছে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, প্রশাসনের এই তড়িঘড়ি প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে যে বিষয়টি নিয়ে সরকার চাপে রয়েছে। আবার অন্য মহলের দাবি, দীর্ঘদিনের অপরাধমূলক রেকর্ড সামনে এনে সরকার নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে চাইছে।
তদন্তের দিকে তাকিয়ে সবাই
সব মিলিয়ে অমৃত মণ্ডলের মৃত্যু ঘিরে রহস্য, বিতর্ক ও রাজনৈতিক চাপ—সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। সরকার একদিকে যেমন গণপিটুনির নিন্দা করছে, অন্যদিকে তেমনি তাঁকে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ হিসেবে তুলে ধরে জনরোষের ব্যাখ্যা দিচ্ছে।
এখন দেখার বিষয়, চলমান তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে এবং প্রশাসনের দাবি কতটা প্রমাণিত হয়। আপাতত এই ঘটনার প্রতিটি দিকেই নজর রাখছে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহল।



