এসআইআর (Special Intensive Revision) হিয়ারিং শুরু হতেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে নতুন করে আতঙ্কের আবহ তৈরি হয়েছে। বহু মানুষ, বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষজন, এই হিয়ারিং নোটিস পেয়ে প্রবল মানসিক চাপে ভুগছেন বলে অভিযোগ উঠছে। কোথাও কোথাও সেই আতঙ্ক এতটাই তীব্র আকার ধারণ করছে যে তা প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। ইতিমধ্যেই পশ্চিম মেদিনীপুর ও বীরভূম—রাজ্যের দুই জেলায় হিয়ারিংয়ের আতঙ্কে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে দু’জনের মৃত্যুর খবর সামনে এসেছে।
এই ঘটনাগুলি ঘিরে রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রশ্ন উঠছে—এসআইআর হিয়ারিং প্রক্রিয়া কি সাধারণ মানুষের মধ্যে অযথা ভয় ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে?
পশ্চিম মেদিনীপুর: হিয়ারিং নোটিসের পরেই অসুস্থতা, মৃত্যু রাজমিস্ত্রির
প্রথম ঘটনাটি ঘটেছে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার চন্দ্রকোনা দু’নম্বর ব্লকের অন্তর্গত ভগবন্তপুর-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের মহেশপুর গ্রামে। মৃত ব্যক্তির নাম আলম খান (৬৫)। পেশায় রাজমিস্ত্রি আলম খান দীর্ঘদিন ধরেই দিনমজুরির কাজ করে সংসার চালাতেন। তাঁর পরিবার বলতে শুধু স্ত্রী—কোনও সন্তান নেই।
পরিবারের দাবি অনুযায়ী, কয়েক দিন আগে এলাকায় এসআইআর হিয়ারিংয়ের অংশ হিসেবে বিডিও দপ্তরের অধীন ব্লক লেভেল অফিসার (BLO) আলম খানের হাতে একটি নোটিস তুলে দেন। ওই নোটিসে নির্দিষ্ট দিনে হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ ছিল। নোটিস পাওয়ার পর থেকেই আলম খান মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন বলে অভিযোগ পরিবারের।
স্ত্রীর বক্তব্য, “নোটিস পাওয়ার পর থেকেই উনি খুব চিন্তায় ছিলেন। বলছিলেন, যদি নাম কেটে দেয়, তাহলে কী হবে? ভোটার কার্ড ছাড়া সবকিছুই তো আটকে যাবে।” পরিবারের দাবি, সেই রাতেই আলম খানের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়।
এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসআইআর হিয়ারিং নিয়ে সঠিকভাবে মানুষকে বোঝানো হচ্ছে না বলেই এই ধরনের আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে।
বীরভূমের সাঁইথিয়া: সন্তানদের নোটিসেই ভেঙে পড়েন বাবা, মৃত্যু হৃদরোগে
দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটেছে বীরভূম জেলার সাঁইথিয়া থানার অন্তর্গত দক্ষিণ সৃজা গ্রামে। মৃত ব্যক্তির নাম মালেক শেখ। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মালেক শেখ দীর্ঘদিন ধরে উত্তর প্রদেশের বারাণসীতে কাজ করতেন। তাঁর ভোটার কার্ডও বারাণসীর ঠিকানায় তৈরি। যদিও ২০০২ সালের আগে বাংলার ভোটার তালিকায় তাঁর নাম ছিল না বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি মালেক শেখ বাড়িতে ফেরেন। সেই সময়েই তাঁর দুই ছেলে ও এক মেয়ের নামে এসআইআর হিয়ারিংয়ের নোটিস আসে। সন্তানদের নোটিস পাওয়ার পর থেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন মালেক শেখ—এমনটাই অভিযোগ পরিবারের।
পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য, “উনি সবসময় বলতেন, যদি ছেলেমেয়েদের নাম কেটে দেয়, তাহলে ভবিষ্যৎ কী হবে? ভোটার কার্ড না থাকলে সরকারি কাজ, সুযোগ-সুবিধা কিছুই পাওয়া যাবে না।” এই দুশ্চিন্তাই তাঁর উপর প্রবল মানসিক চাপ তৈরি করেছিল বলে দাবি পরিবারের।
কয়েক দিনের মধ্যেই হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় মালেক শেখের। এই ঘটনায় গোটা গ্রামে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে।
আতঙ্ক বনাম বাস্তবতা: রাজনৈতিক তরজা শুরু
এই দুই মৃত্যুকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। পরিবারের অভিযোগ, এসআইআর হিয়ারিংয়ের আতঙ্কই এই মৃত্যুর জন্য দায়ী। অন্যদিকে বিজেপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এই দুই মৃত্যুই স্বাভাবিক মৃত্যু এবং এর সঙ্গে হিয়ারিং প্রক্রিয়ার কোনও সরাসরি সম্পর্ক নেই।
বিজেপি নেতাদের বক্তব্য, এসআইআর একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। অযথা ভয় দেখিয়ে বা মৃত্যুর সঙ্গে এর যোগসূত্র তৈরি করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। তবে বিরোধী মহলের দাবি, প্রশাসন যদি আগে থেকেই মানুষকে সচেতন করত, তাহলে এই মানসিক চাপ তৈরি হতো না।
প্রশ্নের মুখে প্রশাসনের ভূমিকা
এই ঘটনার পর প্রশ্ন উঠছে—এসআইআর হিয়ারিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া শুরু করার আগে সাধারণ মানুষকে কি যথেষ্টভাবে বোঝানো হয়েছে? নোটিস পাওয়ার পর কী করতে হবে, কীভাবে প্রমাণ দিতে হবে, তা কি স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। কারণ ভয় ও অনিশ্চয়তা অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
রাজ্যজুড়ে উদ্বেগের আবহ
সব মিলিয়ে এসআইআর হিয়ারিং শুরু হতেই রাজ্যের একাধিক জায়গায় আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। দু’টি মৃত্যুর ঘটনায় সেই উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে। প্রশাসন, রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজ—সবারই এখন প্রশ্ন, কীভাবে এই প্রক্রিয়াকে মানবিক ও স্বচ্ছ করা যায়, যাতে আর কোনও পরিবার এমন শোকের মুখে না পড়ে।



