বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর নির্যাতনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের ভারত–বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকায় নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মালদহ জেলার হবিবপুর থানার অন্তর্গত বৈদ্যপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের ডাল্লা এলাকায় বুধবার হিন্দু গ্রামবাসীদের উদ্যোগে একটি প্রতিবাদ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এই মিছিল থেকেই রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন বিজেপি বিধায়ক জুয়েল মুর্মু। তাঁর বক্তব্যের পাল্টা জবাবে তীব্র কটাক্ষ ছুড়ে দেয় তৃণমূল নেতৃত্ব, ফলে রাজনৈতিক বাকযুদ্ধ আরও তীব্র আকার নেয়।
সীমান্ত গ্রামে প্রতিবাদের ডাক
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর ধারাবাহিক হামলা, লুটপাট ও নির্যাতনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই সীমান্ত এলাকার মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করছিল। সম্প্রতি এক হিন্দু যুবককে নৃশংসভাবে পুড়িয়ে মারার ঘটনার পর সেই ক্ষোভ আরও তীব্র হয়। অভিযোগ উঠেছে, এই ঘটনার প্রতিবাদে পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলন করতে গেলে পুলিশের পক্ষ থেকে বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং প্রতিবাদকারীদের হেনস্থা করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতির প্রতিবাদেই ডাল্লা এলাকায় হিন্দু গ্রামবাসীরা রাস্তায় নামেন। হাতে প্ল্যাকার্ড, মুখে স্লোগান তুলে তাঁরা বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সরব হন। বিক্ষোভ চলাকালীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মহম্মদ ইউনুসের কুশপুতুল দাহ করা হয়।
মিছিলে অংশ নেন বিজেপি বিধায়ক
এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন হবিবপুর বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক জুয়েল মুর্মু। তিনি অভিযোগ করেন,
“বাংলাদেশে যেভাবে হিন্দুদের উপর অত্যাচার চলছে, তা মানবাধিকার লঙ্ঘনের জ্বলন্ত উদাহরণ। কিন্তু সেই ঘটনার প্রতিবাদ করলে এই রাজ্যে পুলিশ দিয়ে আন্দোলনকারীদের দমন করা হচ্ছে।”
বিধায়কের দাবি, রাজ্য সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে এই ইস্যুকে চেপে রাখার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন,
“যদি এই দমননীতি চলতেই থাকে, তাহলে মানুষ আর চুপ করে বসে থাকবে না।”
‘তৃণমূলকে ছুড়ে ফেলার’ হুঁশিয়ারি
বক্তব্য রাখতে গিয়ে জুয়েল মুর্মু আরও বলেন,
“হিন্দু সমাজের কণ্ঠরোধ করা হলে আগামী দিনে মানুষই তার জবাব দেবে। এই অবস্থা চলতে থাকলে তৃণমূল কংগ্রেসকে ক্ষমতা থেকে ছুড়ে ফেলবে সাধারণ মানুষ।”
এই মন্তব্য ঘিরেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয় জোর চর্চা। বিজেপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, এই বক্তব্য মানুষের ক্ষোভের প্রতিফলন।
তৃণমূলের পাল্টা কটাক্ষ
বিজেপি বিধায়কের এই মন্তব্যের পাল্টা প্রতিক্রিয়া দিতে দেরি করেনি তৃণমূল কংগ্রেস। মালদহ জেলা তৃণমূলের সহ-সভাপতি শুভময় বসু কড়া ভাষায় জবাব দেন। তিনি বলেন,
“এই ধরনের উস্কানিমূলক মন্তব্য করে বিজেপি বিভাজনের রাজনীতি করছে।”
তিনি আরও কটাক্ষ করে বলেন,
“আগামী বিধানসভা নির্বাচনের পর মানুষই বিজেপি বিধায়ক জুয়েল মুর্মুদের ধাওয়া করে রাজনীতি থেকে ছুড়ে ফেলবে। বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখলে বাস্তবের মাটিতে নামতে হবে।”
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক
এই ঘটনার পর আবারও রাজ্য পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিজেপির অভিযোগ, সীমান্ত এলাকায় শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ হলেও পুলিশ নজরদারি ও বাধা সৃষ্টি করছে। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সীমান্ত রাজনীতিতে বাড়ছে উত্তাপ
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের ইস্যু ক্রমশ পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলছে। বিজেপি এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণ জোরদার করছে, অন্যদিকে তৃণমূল এটিকে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার কৌশল বলেই দেখছে।
সব মিলিয়ে, মালদহের ডাল্লা এলাকার এই প্রতিবাদ মিছিল ও তার পরবর্তী রাজনৈতিক সংঘাত স্পষ্ট করে দিচ্ছে—বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রসঙ্গ আগামী দিনে রাজ্যের রাজনীতিতে আরও বড় বিতর্কের জন্ম দিতে চলেছে।



