ভালোবাসা বোধহয় এমনই—কখনও প্রাপ্তির গল্প নয়, কখনও আবার নিঃশব্দ অপেক্ষার নাম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবী বদলে যায়, মানুষ বদলে যায়, কিন্তু কিছু অনুভূতি থেকে যায় অবিকল আগের মতোই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মাঝেই যার শুরু, এমনই এক ভালোবাসার গল্প আজ আবার নতুন করে আলোচনায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই অস্থির সময়ে স্বামীকে হারিয়েছিলেন এক নারী। যুদ্ধের বিভীষিকায় প্রিয় মানুষ হারিয়ে যাওয়া তখন অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। অনেকেই ফিরে আসেননি, অনেকেই আর খোঁজ পাননি তাঁদের আপনজনের। এই বৃদ্ধার জীবনেও সেই যুদ্ধ এনে দিয়েছিল এক গভীর শূন্যতা। সময় এগিয়ে গিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাঁর জীবনের ঘড়ির কাঁটা যেন সেদিন থেকেই থমকে গিয়েছিল।
৫৪ বছর কেটে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ে নতুন করে সংসার পাতাননি তিনি। চারপাশের মানুষ বদলেছে, সমাজ বদলেছে, যুগ বদলেছে—তবুও তাঁর জীবনে আর কেউ আসেনি। কারণ কিছু অপেক্ষা থাকে, যা শেষ হয় না। কিছু ভালোবাসা থাকে, যা আর কোনও বিকল্প খোঁজে না। স্বামী হয়তো আর নেই—এই বিশ্বাস নিয়েই কেটে গিয়েছিল তাঁর জীবনের অর্ধেকের বেশি সময়।
কিন্তু হঠাৎ করেই ভাগ্যের এক অদ্ভুত মোড়। ৫৪ বছর পর সামনে এসে দাঁড়াল সেই মানুষটি—যাকে তিনি হারিয়েছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। চোখের সামনে তাঁকে দেখেই ভেঙে পড়েন বৃদ্ধা। বাঁধ মানেনি চোখের জল। এত বছরের জমে থাকা আবেগ যেন মুহূর্তেই উথলে পড়ে।
কিন্তু সেই মুহূর্তের আনন্দ বেশিক্ষণ টেকেনি। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি জানতে পারেন—এই মানুষটি আজ আর তাঁর নেই। তিনি অন্য কারও স্বামী। সুখেই সংসার করছেন। স্ত্রী, সন্তান, এমনকি নাতি-নাতনিদের নিয়ে তাঁর জীবন এখন পরিপূর্ণ। এই সত্য জানার পর যেন আবার নতুন করে ভেঙে পড়েন বৃদ্ধা। প্রিয় মানুষকে ফিরে পেয়েও তাঁকে ছুঁতে পারেন না—এর চেয়ে বড় কষ্ট বোধহয় আর কিছু হয় না।

এই আবেগঘন মুহূর্তের একটি ভিডিও সম্প্রতি প্রকাশ্যে এসেছে, যা ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। ‘টুডে ইন হিস্ট্রি’ নামের একটি এক্স (পূর্বতন টুইটার) হ্যান্ডল থেকে ভিডিওটি পোস্ট করা হয়েছে। ভাইরাল সেই ভিডিওতে দেখা যায়, এক বৃদ্ধা কখনও রাগের ছলে বৃদ্ধের কান টানছেন, কখনও গালে চিমটি কেটে দিচ্ছেন। আবার পরক্ষণেই স্নেহভরে জড়িয়ে ধরছেন তাঁকে। একের পর এক অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে তাঁর চোখ থেকে।
ভিডিওতে তাঁদের ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন আরও অনেকে। দাবি করা হয়েছে, এই বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা একসময় স্বামী-স্ত্রী ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পরিস্থিতির চাপে তাঁরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। জীবনের স্রোত তাঁদের আলাদা আলাদা পথে নিয়ে যায়।
বছরের পর বছর ধরে প্রথম স্ত্রীর অপেক্ষায় থেকেছেন ওই বৃদ্ধা। তিনি আর বিয়ে করেননি। অন্যদিকে, সেই বৃদ্ধ নিজের জীবন এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন, গড়ে তুলেছেন নতুন সংসার। আজ তাঁর পরিবারে রয়েছে স্ত্রী, সন্তান এবং নাতি-নাতনিরা। জীবন তাঁর কাছে অন্যভাবে ধরা দিয়েছে।
হঠাৎ এত বছর পর প্রথম স্ত্রীর মুখোমুখি হয়ে পড়েন তিনি। পুরনো স্মৃতি ফিরে আসে। আবেগ সামলাতে পারেন না বৃদ্ধা। কিন্তু স্বামীর সুখী সংসার দেখার পর তাঁর মনে জমে ওঠে এক গভীর বেদনা। তবুও অভিযোগ নেই, নেই কোনও দাবি। আছে শুধু মেনে নেওয়া—নিঃশব্দ এক আত্মত্যাগ।
এই না পাওয়ার, ছেড়ে দেওয়ার যুগে এই গল্প যেন এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। আজকের দিনে যখন সম্পর্ক ভাঙে সামান্য ভুল বোঝাবুঝিতেই, সেখানে কেউ কেউ আছেন যাঁরা সারাজীবন অপেক্ষা করে যান, কোনও অভিযোগ ছাড়াই। এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ভালোবাসা মানেই একসঙ্গে থাকা নয়। ভালোবাসা কখনও কখনও হয় সারা জীবন বুকের ভিতর লুকিয়ে রাখা এক নীরব অনুভূতি।
কেউ নিজের ভালোবাসাকে ফিরে পেয়েও ছুঁতে পারে না, কেউ আবার না জেনেই নিজের মতো করে সুখের সংসার গুছিয়ে নেয়। সময় সবকিছু বদলে দেয় ঠিকই, কিন্তু কিছু অনুভূতি থেকে যায়—নীরবে, নিঃশব্দে, আজীবনের জন্য।



