আর ২৪ নয়, ২৫ ঘণ্টায় হবে একদিন : কাজের চাপ, ব্যস্ততা আর সময়ের টানাপোড়েনে আমরা প্রায়ই মজা করে বলি—“দিনটা আর একটু বড় হলে ভালো হতো।” কিন্তু যদি সত্যিই একদিন ২৪ ঘণ্টার বদলে ২৫ ঘণ্টার হয়ে যায়? শুনতে কল্পনার মতো লাগলেও বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, বাস্তবে এমনটা একেবারে অসম্ভব নয়। বরং পৃথিবীর চলমান পরিবর্তনের দিক থেকে দেখলে, এই ধারণার পিছনে রয়েছে শক্ত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। যদিও এতে আনন্দের কিছু নেই—উল্টে এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভয়ংকর মহাজাগতিক ইঙ্গিত।
২৪ ঘণ্টার দিন কি সত্যিই স্থায়ী?
আমরা সাধারণত ধরে নিই, একদিন মানেই ২৪ ঘণ্টা। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, এই ধারণা পুরোপুরি স্থির নয়। আসলে ২৪ ঘণ্টা হলো গড় সৌর দিবস—অর্থাৎ সূর্য আকাশে একই অবস্থানে ফিরে আসতে যে সময় লাগে। পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি যদি একেবারে স্থির হতো, তবে দিনের দৈর্ঘ্য কখনও বদলাত না। কিন্তু বাস্তবে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সামান্য হলেও পরিবর্তিত হচ্ছে।
এই পরিবর্তন এতটাই সূক্ষ্ম যে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে তা অনুভব করা সম্ভব নয়। তবুও আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে বিজ্ঞানীরা মিলিসেকেন্ড স্তরে এই পরিবর্তন ধরতে পারছেন।
পৃথিবীর ঘূর্ণন ধীর হচ্ছে কেন?
বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর ঘূর্ণন ধীরে হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রয়েছে চাঁদের মহাকর্ষীয় প্রভাবের।
চাঁদের আকর্ষণের ফলে পৃথিবীর মহাসাগরে জোয়ার-ভাটা সৃষ্টি হয়। এই জোয়ার-ভাটার ঘর্ষণ পৃথিবীর ঘূর্ণনের উপর অনেকটা ব্রেকের মতো কাজ করে। ফলে অল্প অল্প করে পৃথিবীর ঘূর্ণন শক্তি কমে যায়। এরই ফলস্বরূপ, একদিনের দৈর্ঘ্য ধীরে ধীরে বাড়ছে।
এই প্রক্রিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—চাঁদ প্রতি বছর পৃথিবী থেকে প্রায় ৩.৮ সেন্টিমিটার দূরে সরে যাচ্ছে। অর্থাৎ পৃথিবী ও চাঁদের এই টানাপোড়েন দিনের দৈর্ঘ্য বাড়ানোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও রয়েছে
শুধু চাঁদই নয়, পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যের পরিবর্তনও দিনের দৈর্ঘ্যের উপর প্রভাব ফেলছে। নাসা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকার বরফ দ্রুত গলছে। এর ফলে পৃথিবীর ভরের বণ্টনে পরিবর্তন হচ্ছে।
যখন পৃথিবীর ভর এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরে যায়—যেমন বরফ গলে জল সমুদ্রে চলে এলে—তখন পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষ ও গতি সামান্য হলেও বদলে যায়। এই কারণেও দিনের দৈর্ঘ্য কয়েক মিলিসেকেন্ড করে বেড়ে যাচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা কীভাবে এত নিখুঁত হিসাব করেন?
এই পরিবর্তনগুলো খালি চোখে বোঝা যায় না। তাই বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেন অত্যাধুনিক জিওডেসি প্রযুক্তি। এর মধ্যে রয়েছে—
- পারমাণবিক ঘড়ি
- স্যাটেলাইট লেজার রেঞ্জিং
- দূরবর্তী কোয়াসার থেকে আসা রেডিও সিগন্যাল
এই সব তথ্য বিশ্লেষণ করে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি অত্যন্ত নির্ভুলভাবে পরিমাপ করা হয়। গত একশো বছরের ডেটা বিশ্লেষণ এবং আধুনিক মেশিন লার্নিং মডেলের সাহায্যে ভবিষ্যতের হিসাবও করা হচ্ছে।
তাহলে কবে ২৫ ঘণ্টার দিন?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানেই। বিজ্ঞানীদের বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, যদি পৃথিবীর ঘূর্ণন এভাবেই ধীরে হতে থাকে, তাহলে একদিন ২৫ ঘণ্টা হতে এখনও প্রায় ২০ কোটি বছর সময় লাগবে।
অর্থাৎ, আমাদের জীবনকালে বা আগামী বহু প্রজন্মের মধ্যেও এমনটা ঘটার কোনও সম্ভাবনা নেই। এটি একেবারেই সুদূর ভবিষ্যতের একটি মহাজাগতিক পরিবর্তন।
তাহলে ভয় কেন?
ভয়ের কারণ হলো, এই পরিবর্তন নিজে কোনও বিপদ নয়, কিন্তু এটি পৃথিবীর দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের একটি ইঙ্গিত। দিনের দৈর্ঘ্য বাড়া মানে—
- পৃথিবীর ঘূর্ণন শক্তি কমছে
- জলবায়ু ও মহাকর্ষীয় ভারসাম্যে পরিবর্তন আসছে
- গ্রহের ভৌত কাঠামোয় ধীরে ধীরে রদবদল ঘটছে
এই সব পরিবর্তন একসঙ্গে ভবিষ্যতে পৃথিবীর পরিবেশ, জলবায়ু ও বাসযোগ্যতার উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
শেষ কথা
২৪ ঘণ্টার বদলে ২৫ ঘণ্টার দিন—এই ভাবনাটা যতটা রোমাঞ্চকর মনে হয়, বাস্তবে ততটাই গভীর ও জটিল। এটি কোনও তাৎক্ষণিক বিপর্যয়ের সংকেত নয়, আবার নিছক কল্পনাও নয়। বরং এটি আমাদের গ্রহের দীর্ঘমেয়াদি বিবর্তনের একটি নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
সময় হয়তো আমাদের জীবনে কমই লাগে, কিন্তু মহাবিশ্বের ঘড়িতে পৃথিবী ধীরে ধীরে নিজের সময় বদলাচ্ছে—নিঃশব্দে, অবিরাম।



