India Pakistan Relations : দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে জল যে আগামী দিনে বড় কৌশলগত অস্ত্র হয়ে উঠতে চলেছে, তা আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠছে ভারতের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে। সীমান্ত উত্তেজনা, কূটনৈতিক দূরত্ব এবং রাজনৈতিক চাপের মাঝেই ভারতের একের পর এক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এগিয়ে চলেছে পূর্ণ গতিতে। আর তাতেই ঘুম উড়েছে ইসলামাবাদের।
ভারতের এই পরিকল্পনা যে এত বড় চাপ তৈরি করতে পারে, তা আগেভাগে বুঝতে পারেনি পাকিস্তান—এমনটাই মত আন্তর্জাতিক কৌশল বিশ্লেষকদের। বিশেষ করে চেনাব নদীকে কেন্দ্র করে ভারতের চারটি বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প পাকিস্তানের জল নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
🚧 চেনাবের উপর ভারতের বড় সিদ্ধান্ত
সম্প্রতি ভারত সরকার জম্মু ও কাশ্মীর অঞ্চলে চেনাব নদী ও তার উপনদীগুলির উপর চলমান একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দিয়েছে। সরকারি সূত্র অনুযায়ী—
- পাকাল দুল ও কিরু প্রকল্প চালু করার লক্ষ্য ডিসেম্বর ২০২৬
- কোয়ার প্রকল্প শেষ করার সময়সীমা মার্চ ২০২৮
- রাতলে প্রকল্পের নির্মাণকাজ কৌশলগত গুরুত্বের কারণে আরও ত্বরান্বিত করার নির্দেশ
এই নির্দেশ এসেছে বিদ্যুৎমন্ত্রী মনোহর লাল খট্টরের দু’দিনের জম্মু ও কাশ্মীর সফরের পর। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই প্রতিটি প্রকল্প সম্পন্ন করাই সরকারের অগ্রাধিকার।
💧 কেন চেনাব পাকিস্তানের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ?
চেনাব নদী শুধুমাত্র একটি নদী নয়—পাকিস্তানের কাছে এটি কার্যত লাইফলাইন। এই নদী সিন্ধু অববাহিকার অংশ, যার উপর পাকিস্তানের গোটা কৃষি ও জলব্যবস্থার ভিত্তি দাঁড়িয়ে।
পরিসংখ্যান বলছে—
- পাকিস্তানের প্রায় ৭৫ শতাংশ জল আসে পশ্চিম দিক দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলি থেকে
- দেশের ৯০ শতাংশেরও বেশি কৃষিকাজ সিন্ধু অববাহিকার উপর নির্ভরশীল
- প্রায় ১০ জনের মধ্যে ৯ জন পাকিস্তানি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই নদীগুলোর জলের উপর নির্ভর করে
এই নদীগুলি প্রথমে ভারতের ভূখণ্ড দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করে—এই বাস্তবতাই ইসলামাবাদের সবচেয়ে বড় অস্বস্তির কারণ।
⚡ পাকাল দুল: পাকিস্তানের দুশ্চিন্তার কেন্দ্রে
সব প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ হল কিশতওয়ারে অবস্থিত পাকাল দুল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।
এই প্রকল্পের বৈশিষ্ট্য—
- ক্ষমতা: ১,০০০ মেগাওয়াট
- উচ্চতা: ১৬৭ মিটার (ভারতের সর্বোচ্চ বাঁধ)
- গুরুত্ব: চেনাব অববাহিকার সবচেয়ে বড় প্রকল্প
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, পাকাল দুল প্রকল্পটি পশ্চিম দিকে প্রবাহিত নদীর উপর ভারতের প্রথম বড় জল সংরক্ষণ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রকল্প। অর্থাৎ, এটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নয়, জলপ্রবাহের সময় ও পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও ভারতকে দেয়।
এই প্রকল্পের উদ্বোধন হয়েছিল ২০১৮ সালের মে মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হাত ধরে। বর্তমানে সিন্ধু জলচুক্তি কার্যত স্থগিত অবস্থায় থাকায়, প্রকল্পটি দ্রুত চালু করার পথে আর বড় কোনও কূটনৈতিক বাধা নেই—যা পাকিস্তানের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
🌾 জল সংকট থেকে খাদ্য সংকট?
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই প্রকল্পগুলি পুরোপুরি কার্যকর হলে পাকিস্তানের কিছু অঞ্চলে—
- সেচের জলে ঘাটতি
- কৃষি উৎপাদনে ধাক্কা
- পানীয় জলের সংকট
এই তিনটি সমস্যা একসঙ্গে দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে পাঞ্জাব ও সিন্ধ প্রদেশে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি।
পাকিস্তান ইতিমধ্যেই জল সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভুগছে। তার উপর যদি নদীর প্রবাহে নিয়ন্ত্রণ বাড়ে, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে—এমনটাই মনে করছেন পরিবেশ ও কৌশল বিশেষজ্ঞরা।
🔍 কৌশলগত বার্তা দিচ্ছে ভারত?
সব মিলিয়ে স্পষ্ট, ভারতের এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলি শুধুমাত্র উন্নয়ন বা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নয়। এর মধ্যে দিয়ে একটি কৌশলগত বার্তাও দেওয়া হচ্ছে—ভারত এখন নিজের স্বার্থ রক্ষায় জলসম্পদকেও গুরুত্বের সঙ্গে ব্যবহার করতে প্রস্তুত।
আগামী দিনে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে জল যে বড় চাপের হাতিয়ার হয়ে উঠতে চলেছে, চেনাবকে ঘিরে এই পরিস্থিতি তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।



