Kaustav Bagchi : ভোটের আবহে রাজ্যের রাজনীতিতে ফের উত্তাপ। এবার বিতর্কের কেন্দ্রে বাঙালির প্রিয় খাবার—বিরিয়ানি ও মাংস। “মুসলিমদের দোকান থেকে মাংস কেনা যাবে না” এবং “বিরিয়ানি ও মাংস কিনতে হবে হিন্দুদের দোকান থেকেই”—এই মন্তব্য ঘিরেই তীব্র সমালোচনার মুখে বিজেপি নেতা কৌস্তভ বাগচী। তাঁর বক্তব্য সামনে আসতেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে প্রবল বিতর্ক, একই সঙ্গে বিজেপির অন্দরেও শোনা যাচ্ছে ভিন্ন সুর।
ঠিক কী বলেছেন কৌস্তভ বাগচী? কেন এই মন্তব্য ঘিরে এত বিতর্ক? আর দলীয় নেতৃত্বই বা কী অবস্থান নিচ্ছে—জানুন বিস্তারিত।
টিটাগড়ের সভা থেকে ভাইরাল মন্তব্য
সম্প্রতি টিটাগড়ে বিজেপির ‘পরিবর্তন সংকল্প যাত্রা’ কর্মসূচিতে একটি জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে কৌস্তভ বাগচী বলেন, “হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বাড়িতে অনুষ্ঠান হলে বিরিয়ানি খাব, কিন্তু যদি কোনও হিন্দু ভাইয়ের দোকান থাকে, সেখান থেকেই কিনব। হিন্দু ভাইয়ের দোকান ছাড়া বিরিয়ানি কিনব না।”
শুধু বিরিয়ানি নয়, মাংস কেনার ক্ষেত্রেও একই বার্তা দেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে আসে—হিন্দুদের উচিত হিন্দুদের দোকান থেকেই মাংস কেনা। এই মন্তব্যের ভিডিও দ্রুত সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয় রাজনৈতিক শোরগোল।
বিরিয়ানি থেকে সাম্প্রদায়িক বিতর্ক
বাঙালির সংস্কৃতিতে বিরিয়ানি শুধুই খাবার নয়—উৎসব, আনন্দ, মিলনমেলার প্রতীক। জন্মদিন, বিয়ে, আশীর্বাদ কিংবা ঝগড়া মেটানো—সব জায়গাতেই বিরিয়ানি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেই খাবারকে ঘিরেই যখন ধর্মীয় বিভাজনের বার্তা উঠে আসে, তখন তা যে বিতর্ক তৈরি করবে, সেটাই স্বাভাবিক।
তৃণমূল কংগ্রেস কৌস্তভ বাগচীর মন্তব্যকে সাম্প্রদায়িক ও বিভাজনমূলক বলে আক্রমণ শানিয়েছে। তাদের দাবি, ভোটের আগে পরিকল্পিতভাবেই সমাজে বিভেদ তৈরির চেষ্টা চলছে। তৃণমূল নেতাদের বক্তব্য, মানুষের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে রাজনীতি করা বিপজ্জনক এবং সংবিধান বিরোধী।
কৌস্তভ বাগচীর ব্যাখ্যা ও পাল্টা যুক্তি
সমালোচনার মুখে পড়ে কৌস্তভ বাগচী নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, “আমি বিরিয়ানি খাওয়ার বিরুদ্ধে নই। আমি নিজেও বিরিয়ানি খাই। কিন্তু আমি বলেছি, হিন্দুদের দোকান থাকলে সেখান থেকে কেনা উচিত। হিন্দুদেরই কেন সব সময় সহ্য করতে হবে?”
তিনি আরও দাবি করেন, তিনি হিন্দুদের স্বার্থের কথা বলেছেন বলেই এই মন্তব্য। তাঁকে সাম্প্রদায়িক বলা হলে, সেই তকমা তিনি ‘মাথার মুকুট’ হিসেবে গ্রহণ করবেন বলেও মন্তব্য করেন কৌস্তভ।
এখানেই থামেননি তিনি। একই সভায় টলিউডে বাংলাদেশি শিল্পীদের কাজ করা নিয়েও আপত্তি তোলেন, যা বিতর্ককে আরও উসকে দেয়।
বিজেপির অন্দরেই ভিন্ন সুর
কৌস্তভ বাগচীর মন্তব্য নিয়ে বিজেপির মধ্যেই কিন্তু একমত নয় সবাই। বিজেপির সংখ্যালঘু মোর্চার রাজ্য সভাপতি চার্লস নন্দী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “এটা কৌস্তভ বাগচীর ব্যক্তিগত মতামত। বিজেপি ধর্ম বা জাতপাতের রাজনীতি করে না। আমাদের কাছে ধর্ম মানে গণতন্ত্র আর রাজনীতি মানে উন্নয়ন।”
তিনি আরও বলেন, “কে কী খাবেন, কোথা থেকে খাবেন, সেটা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। আমরা নীতি পুলিশি করতে আসিনি।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজ্য বিজেপির এক শীর্ষ নেতা বলেন, “বিজেপি একটি ধর্মনিরপেক্ষ দল। ব্যক্তিগত মন্তব্যের দায় দল নেবে না।”
এই বিষয়ে রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলেও তিনি সংবাদমাধ্যমে কোনও মন্তব্য করতে চাননি।
ভোটের আগে কেন এই বিতর্ক গুরুত্বপূর্ণ?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটের আগে এ ধরনের মন্তব্য সমাজে মেরুকরণ তৈরি করতে পারে। খাদ্যাভ্যাসের মতো ব্যক্তিগত বিষয়কে রাজনৈতিক হাতিয়ার করা হলে তা সামাজিক সম্প্রীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, এই বিতর্ক বিজেপির জন্য দ্বিমুখী চাপ তৈরি করেছে—একদিকে বিরোধীদের আক্রমণ, অন্যদিকে দলের ভেতরেই অস্বস্তি। অন্যদিকে, তৃণমূল এই ইস্যুকে হাতিয়ার করে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ জোরদার করতে চাইছে।
শেষ কথা
সব মিলিয়ে বলা যায়, বিরিয়ানি ও মাংস নিয়ে কৌস্তভ বাগচীর মন্তব্য রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। ভোটের মুখে এমন বিতর্ক রাজনৈতিক ফায়দা দেবে নাকি উল্টো ক্ষতি করবে, তা সময়ই বলবে। তবে একথা নিশ্চিত, খাবারের থালা থেকে রাজনীতির ময়দান—এই বিতর্ক আপাতত থামার নয়।



