Hydrogen Train India : ভারতীয় রেল পরিবহণ ব্যবস্থায় শুরু হতে চলেছে একেবারে নতুন অধ্যায়। ডিজেল বা বিদ্যুতের বদলে এবার ট্রেন চলবে হাইড্রোজেন জ্বালানিতে, যা কার্যত জলের শক্তিকেই কাজে লাগায়। কম ভাড়া, দ্রুত গতি এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির মেলবন্ধনে জানুয়ারিতেই লাইনে নামতে চলেছে ভারতের প্রথম হাইড্রোজেন চালিত ট্রেন। রেল সূত্রে খবর, এই ট্রেন পরিষেবা শুরু হলে যাত্রী পরিবহণের ক্ষেত্রে বড়সড় পরিবর্তন আসতে পারে।
কী এই হাইড্রোজেন ট্রেন? কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
হাইড্রোজেন ট্রেন মূলত এমন এক ধরনের ট্রেন, যেখানে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয় হাইড্রোজেন গ্যাস। এই হাইড্রোজেন থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় ফুয়েল সেলের মাধ্যমে, আর তার ফল হিসেবে নির্গত হয় শুধুমাত্র জলীয় বাষ্প। অর্থাৎ কার্বন ডাই-অক্সাইড বা ক্ষতিকর গ্যাসের কোনও নির্গমন নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি আগামী দিনে ডিজেলচালিত ট্রেনের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। পরিবেশ দূষণ কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি খরচেও ব্যাপক সাশ্রয় হবে।
বিশ্বের শক্তিশালী হাইড্রোজেন ট্রেনগুলির মধ্যে অন্যতম
ভারতীয় রেল জানিয়েছে, এই নতুন ট্রেনটি বিশ্বের দীর্ঘতম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী হাইড্রোজেন চালিত ব্রডগেজ ট্রেনগুলির মধ্যে একটি হতে চলেছে। জার্মানি ও চিনের আধুনিক প্রযুক্তির সহযোগিতায় হলেও, ট্রেনটির নির্মাণ সম্পূর্ণভাবে দেশেই হয়েছে।
এই ট্রেনে থাকছে—
- মোট ১০টি কোচ
- তার মধ্যে ২টি ড্রাইভিং পাওয়ার কার
- ৮টি সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যাত্রীবাহী কোচ
দুটি পাওয়ার কার মিলিয়ে প্রায় ২৪০০ কিলোওয়াট শক্তি উৎপাদনের ক্ষমতা রয়েছে, যা একে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী হাইড্রোজেন ট্রেনে পরিণত করেছে।
কোন রুটে চলবে ভারতের প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেন?
ভারতের প্রথম হাইড্রোজেন চালিত ট্রেন চালু হচ্ছে হরিয়ানার ঝিন্দ–সোনিপত রুটে। এই রুটে পরীক্ষামূলকভাবে পরিষেবা শুরু করার সমস্ত প্রস্তুতি প্রায় সম্পূর্ণ।
বর্তমানে এই রুটে যাতায়াতে সময় লাগে প্রায় ২ ঘণ্টা। কিন্তু নতুন হাইড্রোজেন ট্রেন চালু হলে সেই সময় কমে দাঁড়াবে মাত্র ১ ঘণ্টা। ফলে নিত্যযাত্রীদের জন্য এটি হবে এক বড় স্বস্তির খবর।

জ্বালানি খরচে কতটা সাশ্রয়?
রেল কর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী—
- এই ট্রেনের ইঞ্জিনে ৩৬০ কেজি হাইড্রোজেন ব্যবহার করে প্রায় ১৮০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করা সম্ভব
- অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে লাগে প্রায় ২ কেজি হাইড্রোজেন
তুলনায়,
- একটি ডিজেল ইঞ্জিনে একই দূরত্ব অতিক্রম করতে লাগে প্রায় ৪.৫ লিটার ডিজেল
এই হিসাব অনুযায়ী, হাইড্রোজেন ট্রেন শুধু পরিবেশবান্ধবই নয়, দীর্ঘমেয়াদে অনেক বেশি অর্থসাশ্রয়ীও।
গতি ও আধুনিক সুবিধা
এই ট্রেনের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার হলেও, যাত্রী পরিষেবার ক্ষেত্রে গতি রাখা হবে প্রায় ১১০ কিমি প্রতি ঘণ্টা।
ট্রেনটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য—
- সব কামরা এসি
- মেট্রোর মতো স্বয়ংক্রিয় দরজা
- দরজা সম্পূর্ণ বন্ধ না হলে ট্রেন চলবে না
- কম শব্দ ও ঝাঁকুনিমুক্ত যাত্রা
এই সমস্ত সুবিধা একত্রে যাত্রীদের দেবে এক আধুনিক ও আরামদায়ক ভ্রমণ অভিজ্ঞতা।
ভাড়া কত হতে পারে?
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হল ভাড়া। রেল সূত্রে খবর, এই হাইড্রোজেন ট্রেনে যাত্রার ভাড়া হতে পারে—
- সর্বনিম্ন ৫ টাকা
- সর্বোচ্চ প্রায় ২৫ টাকা
যদি এই ভাড়ার কাঠামো কার্যকর হয়, তাহলে কম আয়ের যাত্রীদের জন্যও এই পরিষেবা হবে অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
কত খরচে তৈরি হয়েছে এই ট্রেন?
ভারতীয় রেল জানিয়েছে, প্রায় ৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে চেন্নাইয়ের ইন্টিগ্রাল কোচ ফ্যাক্টরি (ICF)-তে এই ট্রেনটি নির্মাণ করা হয়েছে। এটি ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
ভারতের রেল ব্যবস্থায় কী প্রভাব ফেলবে এই উদ্যোগ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হাইড্রোজেন ট্রেন সফল হলে—
- ভবিষ্যতে আরও বহু রুটে এই প্রযুক্তি চালু হতে পারে
- ধাপে ধাপে ডিজেল ট্রেন বন্ধ করার পথ প্রশস্ত হবে
- পরিবেশ দূষণ কমবে উল্লেখযোগ্যভাবে
- ভারত পরিবেশবান্ধব পরিবহণে বিশ্বে নেতৃত্বের জায়গায় পৌঁছতে পারে
উপসংহার
সব মিলিয়ে বলা যায়, কম ভাড়া, কম সময় এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির মেলবন্ধনে ভারতের রেল ব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন আসতে চলেছে। জানুয়ারিতেই যদি এই হাইড্রোজেন ট্রেন সফলভাবে লাইনে নামে, তাহলে তা শুধু একটি নতুন ট্রেন নয়—বরং ভবিষ্যতের পরিবহণ ব্যবস্থার দিশা দেখাবে।



