IPAC Controversy : ভোটের মুখে বাংলার রাজনীতিতে আরও একবার প্রবল ঝড়। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে এবার সরাসরি প্রশ্নের মুখে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এমনকি এই ঘটনাকে ঘিরে মুখ্যমন্ত্রীর নাম আদালতের মামলাতেও যুক্ত হতে চলেছে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, একই দিনে কলকাতা হাই কোর্টে মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস ও এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই ঘটনা বাংলার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন।
আইপ্যাক কর্তার বাড়ি ও অফিসে ইডির হানা
বৃহস্পতিবার সকালে বেআইনি কয়লা পাচার সংক্রান্ত একটি মামলার সূত্র ধরে কলকাতায় একযোগে অভিযান চালায় ইডি। একটি দল যায় সল্টলেকের সেক্টর ফাইভে অবস্থিত আইপ্যাকের দফতরে, অন্য দলটি পৌঁছয় লাউডন স্ট্রিটে আইপ্যাক কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাসভবনে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, আইপ্যাক রাজ্য সরকারের পরামর্শদাতা সংস্থা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করছে।
ইডির এই তল্লাশি অভিযানের খবর পেয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান। অভিযোগ, ইডির তদন্ত চলাকালীন তিনি প্রতীক জৈনের বাড়ি থেকে বিভিন্ন নথি, ফাইল এবং ল্যাপটপ বের করে আনেন। পরে সল্টলেকের আইপ্যাক দফতরেও গিয়ে একই ধরনের পদক্ষেপ করেন মুখ্যমন্ত্রী।
কেন্দ্রীয় সংস্থার কাজে বাধা? উঠছে গুরুতর প্রশ্ন
ইডির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তদন্ত চলাকালীন কেন্দ্রীয় সংস্থার কাজে বাধা দেওয়া হয়েছে। এই অভিযোগকে সামনে রেখেই ফের কলকাতা হাই কোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে ইডি। শুক্রবার বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের বেঞ্চে এই মামলার শুনানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ইডির আইনজীবী ধীরাজ ত্রিবেদী জানিয়েছেন, এই মামলায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও পক্ষভুক্ত করা হচ্ছে।
একই বেঞ্চে তৃণমূল কংগ্রেসের দায়ের করা মামলারও শুনানি রয়েছে। অর্থাৎ, একই দিনে, একই আদালতে মুখোমুখি হতে চলেছে তৃণমূল ও ইডি—যা রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

পাল্টা মামলা তৃণমূলের, ইডির অভিযান ‘বেআইনি’ দাবি
ইডির অভিযানের পর কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে পাল্টা কলকাতা হাই কোর্টে মামলা দায়ের করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। তৃণমূলের অভিযোগ, আইপ্যাকের দফতর ও কর্তার বাড়িতে ইডির তল্লাশি পুরোপুরি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বেআইনি। তাদের দাবি, ভোটের আগে তৃণমূলের নির্বাচনী কৌশল জানতে বিজেপির ইঙ্গিতেই এই অভিযান চালানো হয়েছে।
এই মামলায় তৃণমূলের পক্ষ থেকে ইডি এবং আইপ্যাক—দু’পক্ষকেই যুক্ত করা হয়েছে। আজ বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের এজলাসে এই মামলার শুনানি রয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ কোন দিকে যায়, সেদিকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল।
প্রতিবাদে পথে নামছে তৃণমূল, নেতৃত্বে মুখ্যমন্ত্রী
ইডির অভিযানের প্রতিবাদে রাস্তায় নামছে তৃণমূল কংগ্রেস। যাদবপুর-৮বি বাসস্ট্যান্ড থেকে হাজরা মোড় পর্যন্ত প্রতিবাদ মিছিলের ডাক দেওয়া হয়েছে। এই মিছিলে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অংশ নেবেন বলে দলীয় সূত্রে খবর। বৃহস্পতিবার সারাদিন ধরেই ইডির অভিযান নিয়ে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তোপ দেগেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
তাঁর দাবি, কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলিকে ব্যবহার করে বিরোধী দলগুলিকে ভয় দেখানো হচ্ছে এবং নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতেই এই ধরনের অভিযান চালানো হচ্ছে।
একই দিনে জোড়া মামলার শুনানি, নজরে রাজ্য-রাজনীতি
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—শুক্রবার দুপুরে একই বেঞ্চে একসঙ্গে দুই মামলার শুনানি হবে। একদিকে তৃণমূলের দায়ের করা মামলা, অন্যদিকে ইডির মামলা যেখানে মুখ্যমন্ত্রীর নাম যুক্ত করা হচ্ছে। ভোটের আগে এমন পরিস্থিতি রাজ্য-রাজনীতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত শুধুই আইনি লড়াই নয়, বরং কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের প্রতিফলন। আদালতের রায় কোন দিকে যায়, তার উপর নির্ভর করবে আগামী দিনের রাজনৈতিক সমীকরণ।
উপসংহার
আইপ্যাক ইডি অভিযান ঘিরে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তা নিছক একটি তদন্তে সীমাবদ্ধ নেই। মুখ্যমন্ত্রীর সরাসরি ঘটনাস্থলে যাওয়া, নথি সরানো এবং তার জেরে কেন্দ্রীয় সংস্থার অভিযোগ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হচ্ছে। ভোটের মুখে এই সংঘাত বাংলার রাজনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার।



