West Bengal Politics : বাংলার নির্বাচনী আবহে ফের তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা। সাংবিধানিক পদের অপব্যবহার করে তদন্ত চলাকালীন নথি সরানোর অভিযোগে এবার কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। অভিযোগের কেন্দ্রে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈন। রাজ্য রাজনীতিতে এতদিন নেপথ্যে থেকে কাজ করা প্রতীক আচমকাই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন। প্রশ্ন উঠছে— আইপ্যাক দফতরে কেন নিজে উপস্থিত হলেন মুখ্যমন্ত্রী? প্রতীক জৈনের সঙ্গে তৃণমূলের সম্পর্কই বা কতটা গভীর?
হাইকোর্টে ইডির অভিযোগ কী?
ইডির অভিযোগ অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার আইপ্যাক কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়ি ও সল্টলেকের অফিসে তদন্ত চলাকালীন মুখ্যমন্ত্রী নিজে সেখানে গিয়ে নথিপত্র, ফাইল ও ডিজিটাল ডিভাইস সরিয়ে নেন। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার দাবি, এটি সরাসরি তদন্তে বাধা এবং সাংবিধানিক পদের অপব্যবহার।
এই অভিযোগে মামলা দায়েরের অনুমতি চেয়ে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ইডি। আদালত মামলা দায়েরের অনুমতি দিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। শুক্রবার এই মামলার শুনানি হতে পারে। উল্লেখযোগ্যভাবে, একই দিনে তৃণমূল কংগ্রেসও ইডির অভিযানের বিরুদ্ধে আলাদা মামলা দায়ের করেছে। ফলে বিচারপতি ঘোষের বেঞ্চে একসঙ্গে জোড়া মামলার শুনানি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকা ঘিরে কেন বিতর্ক?
আইপ্যাকের অফিসে ইডির অভিযানের খবর পেয়েই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথমে লাউডন স্ট্রিটে প্রতীক জৈনের বাড়িতে যান। সেখান থেকে নথি ও ল্যাপটপ বের করে আনার পর তিনি সল্টলেকের সেক্টর ফাইভে আইপ্যাকের অফিসেও যান। তদন্ত চলাকালীন এই ধরনের হস্তক্ষেপ আইনত কতটা গ্রহণযোগ্য— সেই প্রশ্নই তুলেছে ইডি।
মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, প্রতীক জৈন তৃণমূল কংগ্রেসের আইটি ও কৌশলগত পরামর্শদাতা। ইডির অভিযান আসলে ভোটের আগে তৃণমূলের নির্বাচনী কৌশল জানার চেষ্টা। তাঁর মতে, এটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
কে এই প্রতীক জৈন?
রাজ্য রাজনীতিতে এতদিন ‘মেঘনাদ’-এর মতো নীরব অথচ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছেন প্রতীক জৈন। ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা প্রতীক আইআইটি বম্বে থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনা করেন। তাঁর লিঙ্কডইন প্রোফাইল অনুযায়ী, ২০০৮ সালে তিনি আইআইটি বম্বেতে ভর্তি হন এবং মেটালার্জিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড মেটেরিয়াল সায়েন্সে বি-টেক ডিগ্রি অর্জন করেন।
পড়াশোনা শেষে কিছুদিন অ্যাক্সিস ব্যাঙ্কে ইন্টার্নশিপ করার পর ২০১২ সালে বহুজাতিক সংস্থা ডেলয়েটে কাজ শুরু করেন। সেখানে প্রায় দেড় বছর কাজ করার পরই তাঁর জীবনের মোড় ঘোরে।
আইপ্যাকের উত্থান ও প্রতীকের ভূমিকা
২০১৩ সালে প্রশান্ত কিশোর ‘সিটিজেনস ফর অ্যাকাউন্টেবল গভর্নেন্স’ নামে যে সংগঠন তৈরি করেন, সেটিই পরবর্তীতে ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি বা আইপ্যাক নামে পরিচিত হয়। এই সংগঠনের সহ-প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে ছিলেন প্রতীক জৈন, ঋষিরাজ সিং ও বিনেশ চন্দেল।
পরবর্তীতে প্রশান্ত কিশোর সক্রিয় রাজনীতি ও পরামর্শের কাজ থেকে সরে দাঁড়ালে আইপ্যাকের দায়িত্ব মূলত এই তিনজনের কাঁধেই বর্তায়। ২০১৫ সালের পর থেকে আইপ্যাক দেশের একাধিক রাজ্যে ভোটকৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
কোন কোন রাজ্যে কাজ করেছে আইপ্যাক?
আইপ্যাক বিহার, পাঞ্জাব, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র এবং পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করেছে। অনেক ক্ষেত্রেই নির্বাচনী সাফল্যের সঙ্গে আইপ্যাকের নাম জড়িয়েছে। বাংলায় তৃণমূল কংগ্রেসের পরামর্শদাতা হিসেবে এখনও সক্রিয় এই সংস্থা।
প্রশান্ত কিশোর আইপ্যাকের সঙ্গে যুক্ত থাকাকালীন প্রতীক জৈন খুব একটা প্রকাশ্যে আসেননি। তবে এখন পরিস্থিতি বদলেছে। ইডির অভিযানের পর তিনি রাজ্য রাজনীতির অন্যতম আলোচিত মুখ।
সামনে কী হতে পারে?
হাইকোর্টে ইডির মামলায় যদি মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে কড়া পর্যবেক্ষণ আসে, তাহলে তা তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য বড় রাজনৈতিক অস্বস্তির কারণ হতে পারে। অন্যদিকে, তৃণমূলের দাবি— কেন্দ্রীয় সংস্থাকে ব্যবহার করে ভোটের আগে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ভোটের আগে বাংলার রাজনীতিতে আইপ্যাক, প্রতীক জৈন ও মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকা ঘিরে এই বিতর্ক আগামী দিনে আরও তীব্র হতে চলেছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।



