Chicken Neck : হঠাৎ করেই ভারতের সবচেয়ে সংবেদনশীল ভৌগোলিক অঞ্চল—শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’-এ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে জোরদার করল ভারত। আন্তর্জাতিক সীমান্তে নতুন সেনা মোতায়েন, অত্যাধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যূহ এবং একেবারে নতুন ডিজাইনের সীমান্ত বেড়া—সব মিলিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছে নয়াদিল্লি। দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের আবহে এই পদক্ষেপ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডর?
শিলিগুড়ি করিডর, যাকে সাধারণভাবে ‘চিকেনস নেক’ বলা হয়, ভারতের মূল ভূখণ্ডকে উত্তর-পূর্ব ভারতের আটটি রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত করে রাখা একটি সরু ভূখণ্ড। কোথাও কোথাও এই করিডরের প্রস্থ মাত্র ২০–২২ কিলোমিটার। একদিকে নেপাল, অন্যদিকে বাংলাদেশ—দুই দেশের মাঝখানে অবস্থিত এই এলাকা ভারতের কৌশলগত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই করিডরে সামান্য অস্থিরতা তৈরি হলেই উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের মূল অংশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সেই কারণেই এই অঞ্চলকে ভারতের ‘লাইফলাইন’ বলা হয়।
সীমান্তে নতুন সেনা গ্যারিসন ও শক্তি সমাবেশ
গোয়েন্দা সূত্রে জানা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক সীমান্ত ঘেঁষা এই অঞ্চলে অন্তত তিনটি নতুন সেনা গ্যারিসন মোতায়েন করা হয়েছে। এর পাশাপাশি বিএসএফ ও সেনাবাহিনীর যৌথ নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। সীমান্তে অতিরিক্ত সেনা ও আধাসেনা বাহিনী প্রস্তুত রাখা হয়েছে যেকোনও জরুরি পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য।
প্রতিরক্ষা মহলের মতে, এই শক্তি সমাবেশ শুধুমাত্র প্রতিরোধমূলক নয়, বরং আগাম সতর্কতা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন ডিজাইনের সীমান্ত বেড়া, নজরদারিতে আধুনিক প্রযুক্তি
ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তের প্রায় ৭৫ শতাংশ এলাকায় ইতিমধ্যেই বসানো হয়েছে একেবারে নতুন ডিজাইনের আধুনিক বেড়া। প্রায় ১২ ফুট উঁচু এই বেড়া অ্যান্টি-কাটার এবং অ্যান্টি-ক্লাইম্ব প্রযুক্তিতে তৈরি। সহজে কাটা বা টপকে যাওয়া কার্যত অসম্ভব।
এই বেড়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে—
- হাই-রেজোলিউশন নজরদারি ক্যামেরা
- নাইট ভিশন ও থার্মাল ইমেজিং ব্যবস্থা
- আধুনিক এরিয়া ডমিনেশন সিস্টেম
ফলে সীমান্ত এলাকায় পাতা পড়লেও তাৎক্ষণিকভাবে বিএসএফের কন্ট্রোল রুমে সতর্কবার্তা পৌঁছে যাচ্ছে।
আকাশ প্রতিরক্ষা ও মিসাইল শিল্ড
নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে ‘চিকেনস নেক’ অঞ্চলে মোতায়েন রাখা হয়েছে একাধিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। প্রতিরক্ষা সূত্রের দাবি, রাশিয়া থেকে কেনা অত্যাধুনিক এস-৪০০ সারফেস টু এয়ার মিসাইল সিস্টেমকে এই অঞ্চলের সুরক্ষার ঢাল হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
এছাড়াও প্রায় ৮,১৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা মিসাইল সিস্টেম এবং বিশেষ ভৈরব ব্যাটালিয়ন মোতায়েন করা হয়েছে বলে খবর।
বদলাচ্ছে আঞ্চলিক ভূরাজনীতি?
সম্প্রতি দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক সমীকরণে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনূস পাকিস্তানের জয়েন্ট চিফ অফ স্টাফ কমিটির প্রধান জেনারেল শাহির শমশদ মির্জার সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।
যদিও এই বিষয়ে সরকারি স্তরে স্পষ্ট কোনও বিবৃতি আসেনি, তবে ভারতের গোয়েন্দা মহল পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছে বলে জানা যাচ্ছে।
কেন আগাম সতর্ক ভারত?
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, সীমান্তে অনুপ্রবেশ ও চোরাচালানের সম্ভাবনা—এই সবকিছু মাথায় রেখেই ভারত আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় ৪,০৯৬ কিলোমিটার আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে। তার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গেই রয়েছে প্রায় ২,২১৭ কিলোমিটার।
এই দীর্ঘ সীমান্তে যেকোনও অস্থিরতা ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
বড় বার্তা কী?
সব মিলিয়ে স্পষ্ট, ‘চিকেনস নেক’ ঘিরে কোনও ঝুঁকি নিতে রাজি নয় ভারত। আধুনিক প্রযুক্তি, সেনা মোতায়েন ও কৌশলগত প্রস্তুতির মাধ্যমে নয়াদিল্লি বার্তা দিতে চাইছে—দেশের নিরাপত্তা নিয়ে কোনও আপস হবে না।
আগামী দিনে এই অঞ্চলে নিরাপত্তা ব্যবস্থার আরও আধুনিকীকরণ হতে পারে বলেই মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা।



