Nipah Virus vs Covid : নিপা ভাইরাস কি কোভিডের থেকেও বেশি বিপজ্জনক? এই প্রশ্নটাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজ্যজুড়ে। বারাসাতে দুই নার্সের নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনার খবর সামনে আসতেই নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, এই ভাইরাসকে হালকা করে দেখার কোনও সুযোগ নেই। কারণ নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ তুলনামূলকভাবে কম হলেও এর মৃত্যুহার অত্যন্ত ভয়াবহ।
চিকিৎসক মহলের একাংশের মতে, নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে নির্দিষ্ট কোনও কার্যকর ওষুধ বা চিকিৎসা এখনও নেই। সংক্রমণের পর সাত থেকে দশ দিনের মধ্যেই রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই রোগী কোমায় চলে যান, ধীরে ধীরে বিকল হতে শুরু করে মস্তিষ্ক। শেষ পর্যন্ত শ্বাসযন্ত্র কাজ করা বন্ধ করে দিতে পারে। এই কারণেই নিপা ভাইরাসকে বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী ভাইরাস হিসেবে ধরা হয়।
বাংলায় নিপা ভাইরাসের পুরনো ইতিহাস
এই প্রথম নয়। ২০০১ সালে শিলিগুড়িতে নিপা ভাইরাস ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। সেই সময় কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বহু মানুষ আক্রান্ত হন এবং অর্ধশতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে জানা যায়। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে নদিয়াতেও নিপা ভাইরাস সংক্রমণের ঘটনা সামনে আসে। তারও আগে প্রতিবেশী বাংলাদেশে এই ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা গিয়েছিল। অর্থাৎ, এই অঞ্চলে নিপা ভাইরাস নতুন কিছু নয়—এটি বারবার ফিরে আসার প্রবণতা রাখে।
নিপা বনাম কোভিড: কোথায় মিল, কোথায় অমিল?
কোভিড-১৯ অতিমারির অভিজ্ঞতা এখনও মানুষের মনে তাজা। সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিপা ভাইরাসের তুলনা করলে কিছু মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট হয়।
- সংক্রমণের গতি: কোভিড ভাইরাস অত্যন্ত দ্রুত ছড়ায়। অল্প সময়ের মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষ আক্রান্ত হতে পারেন। অন্যদিকে নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ তুলনামূলকভাবে ধীর।
- মৃত্যুহার: কোভিডে আক্রান্তদের বেশিরভাগই সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু নিপা ভাইরাসে মৃত্যুহার অনেক বেশি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নিপা ভাইরাসে আক্রান্তদের ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত মারা যেতে পারেন।
- চিকিৎসা ব্যবস্থা: কোভিডের ক্ষেত্রে ভ্যাকসিন ও একাধিক চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে। নিপা ভাইরাসের ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত কোনও অনুমোদিত ভ্যাকসিন বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই।
এই কারণেই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিপা ভাইরাস সংক্রমণ সংখ্যায় কম হলেও ঝুঁকির দিক থেকে অনেক বেশি মারাত্মক।
কীভাবে শরীরে প্রবেশ করে নিপা ভাইরাস?
অনেকের মধ্যেই ভুল ধারণা রয়েছে যে নিপা ভাইরাস শুধুমাত্র মাংস খাওয়ার মাধ্যমে ছড়ায়। বাস্তবে বিষয়টি আরও জটিল।
নিপা ভাইরাস মূলত ছড়ায়—
- সংক্রামিত প্রাণীর সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শে এলে
- প্রাণীর শরীরের তরল পদার্থ (লালা, মূত্র, রক্ত) থেকে
- দূষিত খাবার বা পানীয়ের মাধ্যমে
বিশেষ করে বাদুড় এই ভাইরাসের প্রাকৃতিক বাহক। বাদুড় কামড়ানো বা আধখাওয়া ফল খেলে, কিংবা কাঁচা তালের রস পান করলে নিপা ভাইরাস শরীরে ঢুকতে পারে। শুয়োর সরাসরি বাহক না হলেও, সংক্রামিত খামার থেকে পাওয়া শুয়োরের মাংস খেলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এই সময় কোন খাবার এড়িয়ে চলবেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছু বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা জরুরি—
- কাঁচা বা আধসেদ্ধ মাংস একেবারেই খাবেন না
- শুয়োরের মাংস আপাতত এড়িয়ে চলাই নিরাপদ
- কাঁচা তালের রস পান করবেন না
- রাস্তার কাটা ফল বা ভাল করে না ধোয়া ফল খাবেন না
- বাইরের খোলা খাবার থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকুন
মাংস খেতে ভালোবাসলেও এই সময়ে সামান্য লোভ বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে বলে সতর্ক করছেন চিকিৎসকরা।
কী কী সতর্কতা মানা জরুরি?
নিপা ভাইরাস থেকে বাঁচতে কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চলাই সবচেয়ে কার্যকর—
- N-95 বা ভালো মানের মাস্ক ব্যবহার
- বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোয়া
- অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা
- জ্বর, মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া
শেষ কথা
সব মিলিয়ে বলা যায়, নিপা ভাইরাস কোনওভাবেই কোভিডের তুলনায় কম বিপজ্জনক নয়। বরং সংক্রমণ কম হলেও এর প্রাণঘাতী ক্ষমতা অনেক বেশি। আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকাই একমাত্র পথ। সামান্য অসতর্কতা যে বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে, তা ভুলে গেলে চলবে না। সতর্কতা, পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললেই এই মারাত্মক ভাইরাসের বিরুদ্ধে নিজেদের সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।



