Artificial Sun China : সূর্য না উঠলেও কি পৃথিবী আলোয় ভরে উঠতে পারে? এই প্রশ্নটাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে গোটা বিশ্বের বিজ্ঞানমহলে। কারণ আবারও এক চাঞ্চল্যকর বৈজ্ঞানিক সাফল্যের দাবি করেছে চীন। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে তারা এমন এক শক্তির উৎস তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যাকে বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘কৃত্রিম সূর্য’। এই আবিষ্কার শুধু বিজ্ঞান নয়, রাজনীতি, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ শক্তি ব্যবস্থার দিক থেকেও বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
চীনের এই ‘কৃত্রিম সূর্য’-এর প্রকৃত নাম হলো EAST (Experimental Advanced Superconducting Tokamak)। এটি মূলত একটি নিউক্লিয়ার ফিউশন রিঅ্যাক্টর, যার মাধ্যমে সূর্যের কেন্দ্রের মতো পরিবেশ কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়। ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি EAST এক ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করে, যখন এটি টানা ১,০৬৬ সেকেন্ড, অর্থাৎ প্রায় ১৭ মিনিট ধরে স্থিতিশীল প্লাজমা ধরে রাখতে সক্ষম হয়। এর আগে এই রিঅ্যাক্টরই ৪০৩ সেকেন্ডের একটি রেকর্ড করেছিল। নতুন এই সাফল্য আগের রেকর্ডকে দ্বিগুণেরও বেশি ছাড়িয়ে গিয়েছে।
প্লাজমা কী এবং কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ—এই প্রশ্ন অনেকের মনেই উঠছে। প্লাজমা হলো পদার্থের চতুর্থ অবস্থা, যেখানে গ্যাসকে অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করলে তার ইলেকট্রনগুলো নিউক্লিয়াস থেকে আলাদা হয়ে যায়। এই অবস্থাতেই সূর্য ও অন্যান্য নক্ষত্রে নিউক্লিয়ার ফিউশন ঘটে, যার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হয়। পৃথিবীতে এই একই পরিবেশ তৈরি করাই নিউক্লিয়ার ফিউশন গবেষণার মূল লক্ষ্য।
চীনের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, প্লাজমা নিয়ন্ত্রণের জন্য তারা অত্যাধুনিক চুম্বকীয় ক্ষেত্র, উন্নত কুলিং সিস্টেম এবং রিয়েল-টাইম কন্ট্রোল প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে। এই কারণেই এত দীর্ঘ সময় ধরে প্লাজমাকে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় প্লাজমা ধরে রাখা মানেই ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে ফিউশন শক্তি উৎপাদনের পথে আরও এক ধাপ এগোনো।
এই সাফল্যের ফলে চীন কার্যত আমেরিকা, ইউরোপ এবং জাপানের মতো শক্তিধর দেশগুলিকে পিছনে ফেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক। কারণ এত দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল ফিউশন পরীক্ষায় সফলতা এখনও পর্যন্ত খুব কম দেশই দেখাতে পেরেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—চীন কি ভবিষ্যতের শক্তি বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য কায়েম করার পথে হাঁটছে?
নিউক্লিয়ার ফিউশন শক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি পরিবেশবান্ধব, কার্বন নির্গমনহীন এবং তাত্ত্বিকভাবে অসীম শক্তির উৎস। ফসিল ফুয়েল বা প্রচলিত নিউক্লিয়ার শক্তির মতো এখানে তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের সমস্যাও তুলনামূলকভাবে অনেক কম। এই কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ফিউশন শক্তিকে ভবিষ্যতের ‘গেম চেঞ্জার’ বলা হচ্ছে।
তবে এই সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গেই ভয় ও সংশয়ও তৈরি হয়েছে। অনেক বিজ্ঞানীর আশঙ্কা, এত বড় শক্তির উৎস যদি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না থাকে, তাহলে তার পরিবেশগত বা প্রযুক্তিগত ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যদিও চীন দাবি করেছে, এই প্রকল্প সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান মেনেই পরিচালিত হচ্ছে।
চীন এখানেই থেমে নেই। EAST-এর পাশাপাশি তারা আরও একাধিক ফিউশন প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা উদ্যোগ যেমন ITER-এর সঙ্গেও যুক্ত রয়েছে। এর মাধ্যমে চীন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছে—ভবিষ্যতের শক্তির নেতৃত্ব তারা নিজেদের হাতেই রাখতে চায়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ‘কৃত্রিম সূর্য’ শুধু একটি বৈজ্ঞানিক সাফল্য নয়, এটি ভবিষ্যতের শক্তি, পরিবেশ এবং বিশ্ব রাজনীতির দিকনির্দেশক হতে পারে। সূর্যের বিকল্প তৈরি করা কি আদৌ সম্ভব? নাকি মানুষ প্রকৃতির সীমা অতিক্রম করতে গিয়ে নতুন বিপদের দরজা খুলছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবে সময়ই।



