Elon Musk AI Project : প্রযুক্তির দুনিয়ায় প্রতিদিনই এমন কিছু আবিষ্কার হচ্ছে, যা একসময় কেবল কল্পবিজ্ঞানের পাতাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এবার যে দাবি সামনে এসেছে, তা রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো— মানুষ কি সত্যিই অমর হতে চলেছে?
আর সেই অমরত্বের পথে নাকি সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিতে চলেছেন বিশ্বের অন্যতম বিতর্কিত ও প্রভাবশালী প্রযুক্তি উদ্যোক্তা এলন মাস্ক।
মৃত্যুকে জয় করে অনন্তকাল বেঁচে থাকার স্বপ্ন মানব সভ্যতার শুরু থেকেই। কবি থেকে দার্শনিক— সকলেই প্রশ্ন তুলেছেন, “অমর কে কোথা কবে?” কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে দাঁড়িয়ে সেই প্রশ্নটাই এবার নতুন করে আলোচনায়। মাস্কের সাম্প্রতিক এক মন্তব্য ও প্রকল্প ঘিরে শুরু হয়েছে জোর চর্চা— মানুষের অস্তিত্ব কি এবার মৃত্যুর পরেও টিকে থাকতে পারবে?
অমরত্ব মানে কি শরীরের অমরতা?
প্রথমেই একটি ভুল ধারণা ভেঙে নেওয়া জরুরি। এলন মাস্ক যে ‘অমরত্বের’ কথা বলছেন, তা শারীরিক অমরত্ব নয়। অর্থাৎ মানুষের শরীর কখনও মরবে না— এমন কোনও প্রযুক্তি এখনও বাস্তবে আসেনি। মস্তিষ্কে চিপ বসানো, নিউরালিঙ্ক বা জৈব-প্রযুক্তি নিয়েও বিষয়টি সরাসরি যুক্ত নয়।
বরং এখানে যে অমরত্বের কথা বলা হচ্ছে, তা হলো— তথ্যগত অমরত্ব। অর্থাৎ মানুষের চিন্তা, স্মৃতি, পরিচয় ও জীবনগাথা এমনভাবে সংরক্ষিত হবে, যা সময়ের সীমা পেরিয়ে মহাবিশ্বে টিকে থাকবে।
গ্রকিপিডিয়া: অমরত্বের ডিজিটাল দরজা?
এই ভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে এলন মাস্কের নতুন এআই প্রকল্প— গ্রকিপিডিয়া (Grokipedia)। এটি মূলত একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর জ্ঞানভাণ্ডার, যা অনেকটাই উইকিপিডিয়ার বিকল্প হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে। তবে মাস্কের দাবি, গ্রকিপিডিয়া শুধুই তথ্য সংরক্ষণের জায়গা নয়— এটি হতে চলেছে মানব সভ্যতার ডিজিটাল উত্তরাধিকার।
সম্প্রতি নিজের মালিকানাধীন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ গ্রকিপিডিয়া নিয়ে আলোচনার সময় মাস্ক মন্তব্য করেন, এখানে যে কেউ নিজের জীবনকাহিনি বা বায়োগ্রাফি আপলোড করতে পারবেন। আর এখানেই লুকিয়ে রয়েছে তথাকথিত ‘অমরত্বের চাবিকাঠি’।
তথ্য যাবে মহাকাশে!
মাস্কের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গ্রকিপিডিয়ায় সংরক্ষিত নির্বাচিত তথ্যের কপি পাঠানো হবে মহাকাশে। শুধু পৃথিবীর ডেটা সেন্টারে আটকে থাকবে না এই তথ্য। চাঁদ, মঙ্গল কিংবা আরও দূরের ইন্টারস্টেলার স্পেসে পাঠানো হবে মানুষের জীবনগাথা।
অর্থাৎ, কোনও একদিন যদি কোনও ভিনগ্রহী সভ্যতার অস্তিত্ব পাওয়া যায়, তারা জানতে পারবে— নীল গ্রহ পৃথিবীতে কেমন ছিল মানুষের জীবন, চিন্তাভাবনা, সংস্কৃতি ও ইতিহাস।
এভাবেই একজন মানুষ মৃত্যুর পরেও তার অস্তিত্ব রেখে যেতে পারবে মহাবিশ্বের বুকে। শারীরিকভাবে নয়, কিন্তু তথ্য ও পরিচয়ের মাধ্যমে।
কল্পবিজ্ঞান থেকে বাস্তবের পথে
এই ভাবনার পেছনে রয়েছে জনপ্রিয় কল্পবিজ্ঞান লেখক আইজ্যাক আসিমভের প্রভাব। তাঁর বিখ্যাত ‘ফাউন্ডেশন সিরিজ’-এ যে ‘এনসাইক্লোপিডিয়া গ্যালাক্টিকা’র কথা বলা হয়েছিল, গ্রকিপিডিয়ার ধারণা অনেকটাই সেখান থেকেই অনুপ্রাণিত।
মাস্ক বহুবার স্বীকার করেছেন, তিনি কল্পবিজ্ঞানের ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে আগ্রহী। টেসলা, স্পেসএক্স কিংবা নিউরালিঙ্ক— সব ক্ষেত্রেই সেই প্রবণতা দেখা গেছে। গ্রকিপিডিয়া সেই ধারাবাহিকতারই অংশ।
তাহলে কি সত্যিই অমর হয়ে যাব মানুষ?
এই প্রশ্নের উত্তর এককথায় দেওয়া সম্ভব নয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি অমরত্বের প্রচলিত সংজ্ঞাকে বদলে দিচ্ছে। এখানে জীবন দীর্ঘ করার বদলে, মানব পরিচয়কে সময়ের বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে এই ধারণা নিয়ে বিতর্কও কম নয়।
প্রশ্ন উঠছে—
- কার তথ্য যাবে মহাকাশে?
- তথ্য বিকৃত হলে দায় কার?
- ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কোথায় থাকবে?
- অমরত্ব কি সত্যিই সবার জন্য, নাকি কেবল প্রযুক্তি-সক্ষমদের জন্য?
এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও অস্পষ্ট। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত— এলন মাস্ক আবারও এমন এক ধারণা সামনে এনেছেন, যা মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
উপসংহার
মৃত্যুকে জয় করার মানুষের স্বপ্ন হয়তো আজও অধরা। কিন্তু প্রযুক্তির সাহায্যে যদি মানুষের গল্প, চিন্তা আর পরিচয় অনন্ত মহাবিশ্বে ভেসে থাকতে পারে, তবে সেটাও কি এক ধরনের অমরত্ব নয়?
গ্রকিপিডিয়া বাস্তব রূপ পেলে, হয়তো ভবিষ্যতে বলা হবে—
মানুষ মরে গেলেও তার অস্তিত্ব মুছে যায়নি।



