দেশজুড়ে সাম্প্রতিক সময়ে বেড়ে চলা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার আবহে এবার বাংলার মাটিতে সামনে এল এক ভয়ঙ্কর ও উদ্বেগজনক ঘটনা। ধর্মীয় স্লোগান জোর করে বলাতে গিয়ে মারধর, লুটপাট ও ভাঙচুর—এই ঘটনায় প্রশ্নের মুখে সমাজের সহনশীলতা ও সম্প্রীতির পরিবেশ। অভিযোগ, “জয় শ্রী রাম” না বলায় চার মুসলিম যুবকের উপর হামলা চালানো হয়, ভাঙা হয় গাড়ির কাচ, ছিনিয়ে নেওয়া হয় টাকা ও মোবাইল। ঘটনাটি ঘিরে আতঙ্ক ছড়িয়েছে মালদার হরিশ্চন্দ্রপুর এলাকায়।
এই ঘটনা নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে—ধর্ম কি আজ রাজনীতির হাতিয়ার হয়ে উঠছে? ভক্তির নামে কি আদৌ ঈশ্বরের শিক্ষা মানা হচ্ছে, নাকি উগ্র মতাদর্শের প্রভাবে সমাজ ক্রমেই সহিংসতার পথে এগোচ্ছে?
কোথায় ও কীভাবে ঘটল এই ঘটনা?
ঘটনাটি ঘটেছে মালদা জেলার হরিশ্চন্দ্রপুর থানার অন্তর্গত গড়গড়ি এলাকায়। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মধ্যরাতে চার চাকা গাড়িতে করে বাড়ি ফিরছিলেন চার মুসলিম যুবক। তাঁরা হলেন দক্ষিণ তালসুর গ্রামের বাসিন্দা মাসেদুর রহমান, ইব্রাহিম আলি, সহিদ আনোয়ার ও মুজাহিদুল ইসলাম।
অভিযোগ, গড়গড়ি এলাকায় পৌঁছতেই কয়েকজন দুষ্কৃতী তাঁদের গাড়ি আটকায়। এরপরই জোর করে “জয় শ্রী রাম” স্লোগান দিতে চাপ দেওয়া হয়। যুবকরা এতে আপত্তি জানালে শুরু হয় মারধর। গাড়ির কাচ ভেঙে দেওয়া হয়, বেধড়ক মারধর করে জখম করা হয় চারজনকেই।
মারধরের পাশাপাশি লুটপাটের অভিযোগ
শুধু শারীরিক নিগ্রহেই থেমে থাকেনি অভিযুক্তরা। অভিযোগ অনুযায়ী, এক যুবকের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং ব্যাগে থাকা প্রায় ৭৫ হাজার টাকা লুট করা হয়। পুরো ঘটনাটি ঘটে গভীর রাতে, রাস্তায় কার্যত কেউ না থাকায় দুষ্কৃতীরা নির্বিঘ্নেই তাণ্ডব চালায়।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে অভিযুক্তরা পালিয়ে যায়। আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন তাঁরা।
কারা অভিযুক্ত?
আক্রান্তদের অভিযোগের ভিত্তিতে গড়গড়ি এলাকার বাসিন্দা চন্দন মাহালি, সাগর মাহালি ও মিঠুন রজক সহ মোট আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, চন্দন মাহালির নেতৃত্বেই এই হামলা চালানো হয়। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্তরা পলাতক রয়েছে।
হরিশ্চন্দ্রপুর থানার পুলিশ ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে। অভিযুক্তদের খোঁজে তল্লাশি চালানো হচ্ছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।
স্থানীয়দের ক্ষোভ ও উদ্বেগ
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়েছে। তাঁদের দাবি, ধর্মের নামে জোরজবরদস্তি ও হিংসা কোনওভাবেই বরদাস্ত করা যায় না। অবিলম্বে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের বক্তব্য, একের পর এক উত্তেজনামূলক ভাষণ ও সাম্প্রদায়িক উসকানি সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। তারই ফলস্বরূপ এই ধরনের ঘটনা ঘটছে।
ধর্ম বনাম মানবিকতা—প্রশ্নের মুখে সমাজ
এই ঘটনায় বড় প্রশ্ন উঠে এসেছে—যাঁরা ধর্মের নামে স্লোগান দিতে বাধ্য করছেন, তাঁরা কি আদৌ সেই ধর্মের মূল শিক্ষা জানেন? ভগবান রামের আদর্শ কি হিংসা, লুটপাট ও জোরজবরদস্তিকে সমর্থন করে? নাকি উগ্রবাদী নেতাদের ভাষণ ও প্ররোচনায় প্রভাবিত হয়েই তৈরি হচ্ছে এই ঘৃণার পরিবেশ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্মীয় পরিচয়কে অস্ত্র করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার প্রবণতাই সমাজকে ধীরে ধীরে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনার পর পুলিশের তৎপরতা শুরু হলেও, এখনও অভিযুক্তরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সাধারণ মানুষের দাবি, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে।
উপসংহার
সব মিলিয়ে, ধর্মের নামে এই ধরনের জোরজবরদস্তি, হিংসা ও লুটপাট শুধু একটি সম্প্রদায় নয়, গোটা সমাজের ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দেয়। শান্তি, সহাবস্থান ও মানবিকতার ঐতিহ্যে গড়া বাংলায় এই ধরনের ঘটনা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করাই এখন সাধারণ মানুষের একমাত্র দাবি। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত না হলে সমাজে ভয় ও বিভাজনের এই চক্র থামানো কঠিন হয়ে পড়বে।



