India Europe Trade Deal : বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে বড়সড় বার্তা দিল ভারত। আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ট্যারিফ হুমকি ও আগ্রাসী বাণিজ্য নীতিকে কার্যত উপেক্ষা করেই ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াল নয়াদিল্লি। সদ্য স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ভারত-ইউরোপ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতেও নতুন সমীকরণ তৈরি করতে চলেছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। প্রশ্ন উঠছে, এই চুক্তিতে কি সত্যিই ঘুম উড়েছে ট্রাম্প শিবিরের? ভারত কি আর আগের মতো আমেরিকার চাপের কাছে মাথা ঝোঁকাতে রাজি নয়?
কী এই ভারত-ইউরোপ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি?
নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৬তম India-EU Summit-এর মঞ্চ থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজেই এই চুক্তিকে “ল্যান্ডমার্ক” বা ঐতিহাসিক বলে উল্লেখ করেছেন। দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের সঙ্গে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (EU) মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছিল। মাঝপথে আলোচনা থমকে গেলেও ২০২২ সালে ফের নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত বহু টানাপড়েন পেরিয়ে এই সমঝোতায় পৌঁছেছে দুই পক্ষ।
বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সংসদে অনুমোদন ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে ২০২৭ সাল নাগাদ এই চুক্তি পুরোপুরি কার্যকর হতে পারে। এর ফলে ভারত ও ইউরোপের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে এক নতুন যুগের সূচনা হবে বলেই আশা করা হচ্ছে।
কোন কোন ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আসতে চলেছে?
এই চুক্তির সবচেয়ে বড় দিক হল শুল্ক ছাড়। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে আমদানি হওয়া বহু পণ্যের উপর থেকে উল্লেখযোগ্য হারে শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে ইউরোপে তৈরি গাড়ি ও অটো সেক্টরের পণ্যের ক্ষেত্রে বড় স্বস্তি মিলতে পারে। ধাপে ধাপে কোনও কোনও ক্ষেত্রে শুল্ক ১০০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। এর ফলে ভারতে বিলাসবহুল ইউরোপীয় গাড়ি, বাইক ও অটো যন্ত্রাংশের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
একই সঙ্গে ইউরোপ থেকে আসা উন্নত মানের মেশিনারি ও যন্ত্রাংশের দাম কমলে ভারতের উৎপাদন খরচও কমবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগে।
ভারতের রপ্তানিতে কী লাভ?
এই চুক্তির ফলে ইউরোপের ২৭টি দেশের বিশাল বাজার আরও সহজে খুলে যাবে ভারতীয় শিল্পের জন্য। জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, বেলজিয়াম সহ EU-এর একাধিক শক্তিশালী অর্থনীতির দেশে ভারতের রপ্তানি বহুগুণে বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের বস্ত্র, চর্মশিল্প, গয়না, ওষুধ, রাসায়নিক, ইস্পাত ও ফার্মাসিউটিক্যাল সেক্টর সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে। বর্তমানে ইউরোপে ভারতীয় বস্ত্র ও পোশাক রপ্তানিতে প্রায় ১০ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। এই চুক্তির ফলে সেই শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে, যার ফলে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের মতো দেশের রপ্তানিকারকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অনেকটাই এগিয়ে যাবে ভারত।
পরিষেবা ক্ষেত্রেও বড় সুযোগ
শুধু পণ্য নয়, সার্ভিস সেক্টরেও এই চুক্তির প্রভাব পড়বে। তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল পরিষেবা, ফিনটেক, কনসাল্টিং ও অন্যান্য পরিষেবা ক্ষেত্রে ভারতীয় সংস্থাগুলির জন্য ইউরোপে কাজ করার সুযোগ আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই ভারত-EU পরিষেবা বাণিজ্যের অঙ্ক বড়, এই চুক্তির ফলে তা আরও বাড়তে পারে।
শুধু বাণিজ্য নয়, কৌশলগত অংশীদারিত্ব
এই চুক্তির প্রেক্ষাপট শুধু অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। গত কয়েক বছরে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ক্রমশ গভীর হয়েছে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, ভারত মহাসাগরে যৌথ নৌ মহড়া, ক্লিন এনার্জি, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও একসঙ্গে কাজ করছে ভারত ও ইউরোপ।
এই ঘনিষ্ঠতা যে আমেরিকার, বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘনিষ্ঠ শিবিরের চোখে ভালো লাগছে না, তা বলাই বাহুল্য। ট্রাম্প বরাবরই উচ্চ শুল্ক ও ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির পক্ষে। ভারতের এই ইউরোপমুখী অবস্থান কার্যত সেই নীতিকে চ্যালেঞ্জ করছে।
ট্রাম্পকে স্পষ্ট বার্তা ভারতের?
কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে ভারত স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিল—চাপের রাজনীতিতে নয়, পারস্পরিক সম্মান ও লাভের ভিত্তিতেই তার বৈদেশিক নীতি চলবে। মার্কিন ট্যারিফ হুমকিকে গুরুত্ব না দিয়ে ইউরোপের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভারত নিজের অবস্থান আরও শক্ত করল।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ভারত-ইউরোপ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি শুধু অর্থনৈতিক লাভের বিষয় নয়, এটি ভারতের বদলে যাওয়া কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রতিফলন। বিশ্ব রাজনীতির দাবার বোর্ডে ভারত যে এখন আত্মবিশ্বাসী ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত, এই চুক্তি তারই জোরালো প্রমাণ।



