Suvendu Adhikari : নন্দীগ্রামে রাজনৈতিক উত্তাপ ফের চরমে। একের পর এক বিস্ফোরক ঘোষণা করে নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। প্রত্যেক হিন্দু বাড়িতে ধ্বজা লাগানো, মন্দিরে মাইক বসানো, গ্রামে গ্রামে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো—এমনই একাধিক কড়া নির্দেশে সরগরম রাজ্য রাজনীতি। শুধু তাই নয়, প্রত্যেক হিন্দু পরিবারে শাঁখ বিতরণের কথাও প্রকাশ্যে বলেছেন তিনি। এমনকি এই কর্মসূচিতে যত টাকা লাগবে, তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেওয়ার কথাও ঘোষণা করেছেন বিরোধী দলনেতা।
প্রশ্ন উঠছে, হঠাৎ কেন হিন্দু সমাজের উদ্দেশে এমন একের পর এক নির্দেশ? নন্দীগ্রামে সমবায় ভোটে তৃণমূল কংগ্রেসের জয়ের পরই কি চাপের মুখে পড়ে নতুন করে বিভাজনের রাজনীতির পথে হাঁটছেন শুভেন্দু অধিকারী? রাজনৈতিক মহলে এখন এই প্রশ্নই সবচেয়ে বেশি ঘুরপাক খাচ্ছে।
সমবায় ভোটে ধাক্কা, তারপরই কড়া বার্তা
নন্দীগ্রামে সাম্প্রতিক সমবায় ভোটে বিজেপির ফলাফল কার্যত হতাশাজনক। রানিচক সমবায় সমিতিতে মোট ৪৫টি আসনের মধ্যে ২৮টিতেই জয় পেয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। বিজেপির ভরাডুবির পরই রাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা নেয়। ভোটের ফল প্রকাশের পর রাতেই বিজেপি সমর্থকদের বাড়িতে হামলার অভিযোগ ওঠে, যা ঘিরে এলাকায় অশান্তি ছড়ায়।
এই পরিস্থিতিতে সোমবার সকালে আক্রান্ত বিজেপি সমর্থকদের বাড়িতে যান শুভেন্দু অধিকারী। সেখান থেকেই তিনি হিন্দুদের উদ্দেশে একাধিক কড়া বার্তা দেন। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে আসে ‘হিন্দু ঐক্য’ এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন।
কী বললেন শুভেন্দু অধিকারী?
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বিরোধী দলনেতা বলেন,
“সব হিন্দু বাড়িতে ধ্বজা লাগাতে হবে। গ্রামে গ্রামে সিসিটিভি বসাতে হবে। এখানকার মৌলবাদীদের আলাদা করে চিহ্নিত করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, প্রতিটি মন্দিরে মাইক বসানো হবে, যাতে ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও বার্তা পৌঁছয় গোটা এলাকায়। শুধু নির্দেশ দিয়েই থেমে থাকেননি শুভেন্দু। তাঁর ঘোষণা, “এই সব কাজের জন্য যত টাকা দরকার হবে, আমি দেব। সিসিটিভির কন্ট্রোল থাকবে আমার এমএলএ অফিসে।”
এছাড়াও প্রত্যেক হিন্দু পরিবারে শাঁখ বিতরণের কথাও বলেন তিনি, যা ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
কেন এখন এই কর্মসূচি?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, নন্দীগ্রামে তৃণমূল কংগ্রেসের সাম্প্রতিক সাফল্য বিজেপির জন্য বড় ধাক্কা। বিশেষ করে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সেবাশ্রয়’ মডেল নন্দীগ্রামে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। সেবাশ্রয় শিবিরের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়ার কৌশল তৃণমূলকে সংগঠনিকভাবে আরও মজবুত করেছে বলে মত রাজনৈতিক মহলের।
এই পরিস্থিতিতে শুভেন্দু অধিকারীর সামনে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ আরও বেড়েছে। বিজেপির নিজের গড় বলে পরিচিত নন্দীগ্রামে পরপর ভোটে ধাক্কা খাওয়ার পর হিন্দু ভোটব্যাঙ্ককে একজোট করাই এখন তাঁর প্রধান লক্ষ্য—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
বিভাজনের রাজনীতি নাকি নিরাপত্তার বার্তা?
তবে শুভেন্দু অধিকারীর এই ঘোষণাকে ঘিরে বিতর্ক তুঙ্গে। শাসকদলের দাবি, ভোটে হার ঢাকতেই ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি শুরু করেছেন বিরোধী দলনেতা। তৃণমূল নেতাদের মতে, নন্দীগ্রামে উন্নয়ন ও জনসংযোগে পিছিয়ে পড়ায় এখন বিভাজনের পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে বিজেপির সমর্থকদের বক্তব্য, সাম্প্রতিক হিংসা ও হামলার অভিযোগের প্রেক্ষিতে হিন্দু সমাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই কর্মসূচি। তাঁদের দাবি, এটি রাজনৈতিক নয়, বরং আত্মরক্ষার ডাক।
রাজ্য রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ
সব মিলিয়ে, নন্দীগ্রামে সমবায় ভোটের ফল প্রকাশের পর শুভেন্দু অধিকারীর এই কড়া বার্তা রাজ্য রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ তৈরি করেছে। সামনে পঞ্চায়েত ও অন্যান্য নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এই ধরনের ঘোষণা রাজ্যের রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও বাড়াবে কি না, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।
নন্দীগ্রামের রাজনীতি কোন দিকে মোড় নেয়, শুভেন্দু অধিকারীর এই কৌশল আদৌ বিজেপিকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করবে কি না—তা বলবে সময়ই।



