Gold Silver News : কখনও কি কল্পনা করেছিলেন, এমন এক সময় আসবে যখন রুপোর দাম কেজি প্রতি ৪–৫ লক্ষ টাকা ছুঁতে পারে? অথবা ১০ গ্রাম সোনার দাম লাখের গণ্ডি বহু দূর ছাড়িয়ে যাবে? কিন্তু এখন আর এসব কল্পনা নয়, এটাই বাস্তব। কার্যত ইতিহাস গড়ছে সোনা ও রুপোর মূল্যবৃদ্ধির গ্রাফ। প্রতিদিন নতুন রেকর্ড, নতুন উচ্চতা ছুঁয়ে চলেছে এই দুই মূল্যবান ধাতু।
ভয়ংকর গতিতে বাড়তে থাকা দামের জেরে সাধারণ মানুষের মনে তৈরি হচ্ছে প্রবল উৎকণ্ঠা। গয়না কেনা তো দূরের কথা, অনেকের কাছেই সোনা এখন স্বপ্নের বস্তু। অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে উত্তেজনা—এই সময় কি আরও বিনিয়োগ করা উচিত, না কি সাবধান হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ? বাজার পরিস্থিতি দেখে অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠছে, এমন পরিস্থিতিতে কি গাড়ি-বাড়ি বিক্রি করেও সোনা-রুপো কিনে রাখা দরকার?
জানুয়ারি মাসজুড়েই লাগামছাড়া ঊর্ধ্বগতি
চলতি বছরের জানুয়ারি মাস জুড়েই সোনা ও রুপোর দামে কার্যত ঝড় বয়ে গিয়েছে। বাজার বিশেষজ্ঞদের হিসেব বলছে, মাত্র এক মাসেই প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে সোনা-রুপোর দাম। এত অল্প সময়ে এমন মূল্যবৃদ্ধি আগে খুব কমই দেখা গিয়েছে।
কলকাতার বাজারে বর্তমানে—
- ২৪ ক্যারেট সোনা (১০ গ্রাম): ১ লক্ষ ৮২ হাজার ৩৩৫ টাকা
- ২২ ক্যারেট সোনা (প্রতি গ্রাম): ১৬ হাজার ৩৯৫ টাকা
- ১৮ ক্যারেট সোনা (প্রতি গ্রাম): ১৩ হাজার ৪১৪ টাকা
অন্যদিকে রুপোর দাম যেন সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে—
- রুপোর দাম (প্রতি গ্রাম): ৪১০ টাকা
- ১০ গ্রাম রুপো: ৪,১০০ টাকা
- ১০০ গ্রাম রুপো: ৪১,০০০ টাকা
- ১ কেজি রুপো: ৪ লক্ষ ১০ হাজার টাকা
এই দামে পৌঁছনোকে অনেকেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত বলে মনে করছেন।
কেন এত দ্রুত বাড়ছে সোনা-রুপোর দাম?
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—হঠাৎ করে কেন এমন হুড়মুড়িয়ে দাম বাড়ছে সোনা ও রুপোর? বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এর পিছনে একাধিক বড় কারণ কাজ করছে।
১️⃣ ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা
গত কয়েক মাস ধরেই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ, সংঘাত, কূটনৈতিক টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ বাজার থেকে সরে এসে নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছেন। আর নিরাপদ বিনিয়োগের তালিকায় সবার উপরে রয়েছে সোনা ও রুপো।
২️⃣ মুদ্রাস্ফীতির চাপ
বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ইতিহাস বলছে, মুদ্রাস্ফীতির সময়ে সোনা বরাবরই নিজের মূল্য ধরে রাখতে সক্ষম। ফলে বহু বিনিয়োগকারী মনে করছেন, ভবিষ্যতের আর্থিক অনিশ্চয়তার হাত থেকে বাঁচতে সোনায় বিনিয়োগ করাই সবচেয়ে নিরাপদ।
৩️⃣ মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার
সম্প্রতি মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সুদের হার অপরিবর্তিত রেখেছে। সুদের হার না বাড়লে ব্যাঙ্কে টাকা রেখে খুব বেশি লাভ হয় না। ফলে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকছেন সোনা-রুপোর মতো মূল্যবান ধাতুর দিকে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দামে।
৪️⃣ আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব
শুধু ভারত নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও সোনা ও রুপোর দাম নতুন নতুন রেকর্ড গড়ছে। বৈশ্বিক বাজারে দামের এই ঊর্ধ্বগতি সরাসরি প্রভাব ফেলছে ভারতের বাজারেও।
সাধারণ মানুষের চিন্তা, বিনিয়োগকারীদের দ্বিধা
এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মাথায় হাত। বিয়ে, অনুষ্ঠান বা সঞ্চয়ের জন্য যাঁরা সোনা কেনার পরিকল্পনা করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই আপাতত পিছিয়ে আসছেন। আবার অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে দ্বিধা—এখন কিনলে লাভ হবে, না কি দাম আরও বাড়ার অপেক্ষা করা উচিত?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সোনা-রুপো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে এখনও নিরাপদ। তবে সব টাকা একসঙ্গে বিনিয়োগ না করে ধাপে ধাপে বিনিয়োগ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
সামনে কী হতে পারে?
বাজার বিশ্লেষকদের একাংশের অনুমান, যদি আন্তর্জাতিক অস্থিরতা ও মুদ্রাস্ফীতির চাপ একইভাবে চলতে থাকে, তাহলে সোনা ও রুপোর দাম আরও বাড়তে পারে। তবে বাজার যে কোনও মুহূর্তে দিক বদলাতে পারে, তাই বিনিয়োগের আগে সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে জরুরি।
সব মিলিয়ে, সোনা-রুপোর দামের এই উত্থান নিঃসন্দেহে ইতিহাসে জায়গা করে নিল। ভবিষ্যতে এই দৌড় কোথায় গিয়ে থামে, সেদিকেই এখন নজর গোটা বাজারের।



