স্বাধীনতার ৭৫ বছর পেরিয়েও কি ভারত এখনও জাত-পাতের বেড়াজাল ভাঙতে পারল না? বরং সমাজকে আরও খণ্ড-বিখণ্ড করার পথে হাঁটছিল কি দেশ? এমনই এক গভীর প্রশ্ন তুলে দিল সুপ্রিম কোর্ট। ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশনের (UGC) এক বিতর্কিত নির্দেশিকায় স্থগিতাদেশ দিয়ে কেন্দ্র সরকারকে কার্যত বড় ধাক্কা দিল শীর্ষ আদালত। বিচারপতিদের কড়া পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট—এই নির্দেশিকা কার্যকর হলে সমাজে ভয়াবহ বিভাজন তৈরি হতে পারত।
কোন নির্দেশিকায় আপত্তি আদালতের?
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে UGC-এর ‘Promotion of Equity in Higher Education Institutions Regulations, 2026’। এই নির্দেশিকার কিছু ধারা নিয়ে অভিযোগ ওঠে, যা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে জাতি ও সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে আলাদা থাকার ব্যবস্থা বা পৃথক হোস্টেলের ইঙ্গিত দেয়। আবেদনকারীদের মতে, এই নির্দেশিকা বাস্তবায়িত হলে শিক্ষা ব্যবস্থার ভিতরেই বিভাজনের বীজ বপন করা হতো।
এই প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চ নির্দেশিকাটির উপর স্থগিতাদেশ জারি করে। একই সঙ্গে কেন্দ্র সরকার ও UGC-কে নোটিস পাঠানো হয়েছে।
“সমাজ টুকরো টুকরো হয়ে যাবে”—প্রধান বিচারপতির কড়া মন্তব্য
শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন,
“এই নির্দেশিকায় এমন কয়েকটি বিষয় রয়েছে, যা কার্যকর হলে তার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। এর ফলে সমাজ বিভক্ত হয়ে পড়তে পারে।”
আদালতের মতে, শিক্ষা ব্যবস্থা কখনওই সামাজিক বিভাজনের হাতিয়ার হতে পারে না। বরং শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত সমাজকে একত্রিত করা, সমতার ভিত্তিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
আমেরিকার উদাহরণ টেনে সতর্কবার্তা
বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী আরও এক ধাপ এগিয়ে সতর্কবার্তা দেন। তিনি আমেরিকার বর্ণবৈষম্যের ইতিহাস টেনে বলেন,
“আমরা এমন পরিস্থিতি চাই না, যেখানে স্কুল বা কলেজে সাদা ও কালো চামড়ার মানুষের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকবে।”
ভারতের মতো বহুত্ববাদী সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই হওয়া উচিত সামাজিক ঐক্যের প্রতীক—এই মন্তব্যে স্পষ্ট আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি।
পৃথক হোস্টেলের ভাবনায় ক্ষোভ
UGC-এর নির্দেশিকায় জাতি বা সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে পৃথক হোস্টেলের ইঙ্গিত নিয়ে সবচেয়ে বেশি আপত্তি তুলেছে আদালত। প্রধান বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন,
“স্বাধীনতার ৭৫ বছর পর আমরা কি পিছনের দিকে হাঁটছি? আমরা নিজেরাই ছাত্রজীবনে হোস্টেলে থেকেছি, সেখানে সব সম্প্রদায়ের পড়ুয়ারা একসঙ্গে থেকেছে।”
তিনি আরও বলেন, দেশে যখন আন্তঃবর্ণ বিবাহকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে, তখন শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে উল্টো পথে হাঁটার কোনও যুক্তি নেই।
কেন বহাল থাকছে ২০১২ সালের নিয়ম?
আদালত সংবিধানের ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করে জানিয়ে দিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত ২০১২ সালের UGC নির্দেশিকাই বহাল থাকবে। বিচারপতি বাগচী প্রশ্ন তোলেন,
“যেখানে ২০১২ সালের নিয়মে বৈষম্যের সংজ্ঞা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা ছিল, সেখানে নতুন করে অস্পষ্ট ধারা যোগ করার প্রয়োজন কেন?”
তাঁর মতে, সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই লক্ষ্য হওয়া উচিত, পশ্চাদপসরণ নয়।
সমাজ ভাগ হওয়ার আশঙ্কা কতটা বাস্তব?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই নির্দেশিকা কার্যকর হতো, তাহলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভাজন আরও গভীর হতো। ছাত্রছাত্রীরা একে অপরকে নাগরিক হিসেবে নয়, বরং আলাদা গোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে দেখতে শুরু করত—যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ঐক্যের পক্ষে মারাত্মক ক্ষতিকর।
শিক্ষামহলে স্বস্তি, কিন্তু নজর পরবর্তী শুনানিতে
সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশে আপাতত স্বস্তিতে শিক্ষামহল, অভিভাবক ও নাগরিক সমাজ। তবে কেন্দ্র সরকার এবং UGC পরবর্তী শুনানিতে কী ব্যাখ্যা দেয়, সেই দিকেই এখন নজর সকলের। এই মামলার রায় শুধু একটি নির্দেশিকার ভবিষ্যৎ ঠিক করবে না, বরং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকনির্দেশও নির্ধারণ করবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে, শীর্ষ আদালতের এই হস্তক্ষেপ নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিল—ভারত কি সত্যিই জাত-পাতমুক্ত সমাজ গড়ার পথে এগোচ্ছে, না কি অজান্তেই পিছিয়ে যাচ্ছে?



