Bhabanipur Assembly : নন্দীগ্রামের পরে কি এবার নিজের খাসতালুক ভবানীপুরেও রাজনৈতিক চাপে পড়তে চলেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়? এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়ায় ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের খসড়া ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৪৫ হাজার ভোটারের নাম বাদ পড়ার ঘটনা নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করেছে।
ভবানীপুর শুধু একটি বিধানসভা কেন্দ্র নয়, এটি মুখ্যমন্ত্রীর রাজনৈতিক শক্তির প্রতীক। ২০২১ সালের উপনির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকেই জয়ী হয়ে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে ফেরেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই কারণে এখানকার ভোটার তালিকায় এত বড় পরিবর্তন শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে নিঃসন্দেহে বড় ধাক্কা।
কতটা বদলেছে ভবানীপুরের ভোটার তালিকা?
নির্বাচন কমিশনের অধীনে চলা SIR প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সম্প্রতি ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগে যেখানে এই কেন্দ্রে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ২ লক্ষ ৬ হাজার ২৯৫ জন, নতুন তালিকায় তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ লক্ষ ৬১ হাজার ৫০৯ জনে। অর্থাৎ এক ধাক্কায় ৪৪ হাজার ৭৮৭ জন ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, যা মোট ভোটারের প্রায় ২১.৭ শতাংশ।
এই বিপুল সংখ্যক নাম বাদ যাওয়া নিয়ে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর চর্চা। বিরোধীদের দাবি, এই ঘটনাই প্রমাণ করছে যে তৃণমূলের শক্ত ভিত নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে শাসকদলের বক্তব্য, এটি সম্পূর্ণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং বৈধ ভোটারদের নাম পুনরায় তালিকাভুক্ত করা হবে।
তড়িঘড়ি বৈঠকে কেন মুখ্যমন্ত্রী?
খবর সামনে আসতেই পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতার কালীঘাটে তাঁর দলীয় কার্যালয়ে জরুরি বৈঠক ডাকেন। ওই বৈঠকে ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের সমস্ত কাউন্সিলর, বিএলএ (Booth Level Agent) এবং সংশ্লিষ্ট নেতাদের উপস্থিত থাকতে বলা হয়।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল—
- কেন এত বড় সংখ্যায় নাম বাদ পড়ল, তার কারণ খতিয়ে দেখা
- কোনও বৈধ ভোটার যেন বাদ না পড়েন, তা নিশ্চিত করা
- দ্রুত সংশোধনের আবেদন জমা দেওয়ার কৌশল নির্ধারণ
মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট নির্দেশ দেন, ভোটার তালিকা নিয়ে কোনও গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না।
তৃণমূলের পাল্টা কৌশল
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস ইতিমধ্যেই মাঠে নামছে। দলীয় নেতৃত্বের নির্দেশে বাড়ি বাড়ি যাচাই অভিযান শুরু করার কথা জানানো হয়েছে। বাদ পড়া প্রতিটি নাম খতিয়ে দেখে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই সংশোধনের আবেদন জমা দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে স্থানীয় নেতাদের।
দলীয় সূত্রের দাবি, ভোটার তালিকায় যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের বড় অংশই স্থানান্তরিত, মৃত অথবা দ্বৈত এন্ট্রির কারণে তালিকা থেকে বাদ গিয়েছেন। তবে কোনও প্রকৃত ভোটার বাদ পড়ে থাকলে তা দ্রুত ঠিক করা হবে।
কোন কোন এলাকায় বেশি প্রভাব?
ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের ৭০, ৭২ ও ৭৭ নম্বর ওয়ার্ডে ভোটার তালিকা থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি সংখ্যায় নাম বাদ পড়েছে বলে জানা গেছে। এই এলাকাগুলিতে সংখ্যালঘু এবং ভিনরাজ্যের বাসিন্দাদের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় রাজনৈতিক ও সামাজিক উদ্বেগ বেড়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভবানীপুর কেন্দ্রের ভোটারদের সামাজিক বিন্যাস প্রায় এমন—
- প্রায় ৪০ শতাংশ গুজরাটি, মারওয়ারি, শিখ ও বিহারি সম্প্রদায়
- প্রায় ২০ শতাংশ মুসলিম ভোটার
- বাকি ৪০ শতাংশ বাঙালি ভোটার
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই কেন্দ্রে সংখ্যালঘু ভোটারদের ভূমিকা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্বাচনের ফল নির্ধারণে বড় প্রভাব ফেলে।
শুধু ভবানীপুর নয়, গোটা রাজ্যেই প্রভাব
ভবানীপুর একমাত্র কেন্দ্র নয়। রাজ্যজুড়ে SIR প্রক্রিয়ায় খসড়া ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৫৮ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে বলে নির্বাচন কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে। কমিশনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মৃত্যু, স্থানান্তর, দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকা বা ভুয়ো ভোটার—এই সব কারণেই মূলত নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
রাজনীতির কোন দিকে মোড় নেবে?
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—SIR প্রক্রিয়া কি সত্যিই শাসকদলের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে? নাকি তৃণমূল সংগঠনের শক্তির জোরেই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে?
মুখ্যমন্ত্রীর কড়া বার্তার পর ভবানীপুরে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে তৎপরতা যে আরও বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য। তবে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই ঘটনা যে বাংলার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।



