ব্যারাকপুর ও মধ্যমগ্রাম—দু’টি এলাকাতেই যার নাম শুনলেই বিরিয়ানির কথা মনে পড়ে, সেই পরিচিত ব্যবসায়ী অনির্বাণ দাসকে ঘিরে ফের তীব্র চাঞ্চল্য। একের পর এক অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং পুলিশের গ্রেফতারি—সব মিলিয়ে ডি বাপি বিরিয়ানি ও অনির্বাণ বিরিয়ানি নামের সঙ্গে জুড়ে গেল আরও এক বিস্ফোরক পারিবারিক কেলেঙ্কারি।
সম্প্রতি মধ্যমগ্রামে অবস্থিত অনির্বাণ দাসের বিরিয়ানি ব্যবসাকে ঘিরে যে নাটকীয় ঘটনা সামনে এসেছে, তা রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়েছে এলাকাবাসীকে। অভিযোগ, অনির্বাণ দাসের স্ত্রী সুমনা দাস তাঁদেরই গাড়ির চালক সমীর সেনের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। সেই পরিকল্পনা কার্যকর করতে গিয়ে এয়ারপোর্ট থানার পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যান চালক সমীর সেন। শুধু তাই নয়, এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই সামনে আসে আরও গুরুতর অভিযোগ—স্ত্রী নির্যাতনের।
কীভাবে শুরু হলো পুরো ঘটনা?
পরিবার সূত্রে জানা যায়, কয়েক মাস আগেই ব্যারাকপুরে অবস্থিত ওই প্রসিদ্ধ বিরিয়ানি ব্যবসায়ীর পারিবারিক অশান্তির ভিডিও সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়। এরপর অনির্বাণ দাস মধ্যমগ্রামে “অনির্বাণ বিরিয়ানি” নামে নতুন ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের অশান্তি যেন তাঁর পিছু ছাড়েনি।
অনির্বাণ দাস পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন, তাঁর স্ত্রী সুমনা দাসকে ফুঁসলিয়ে তাঁদেরই গাড়ির চালক সমীর সেন পালিয়ে যাওয়ার ছক কষেছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রথমে দিঘা, তারপর পুরী ঘুরে শেষ পর্যন্ত মুম্বই যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই এয়ারপোর্ট থানার পুলিশ প্রথমে গ্রেফতার করে চালক সমীর সেনকে। শুক্রবার তাঁকে আদালতে তোলা হবে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।
নাটকীয় মোড়: স্বামীর বিরুদ্ধেই গুরুতর অভিযোগ স্ত্রীর
কিন্তু ঘটনায় নাটকীয় মোড় আসে তখনই, যখন অনির্বাণ দাসের স্ত্রী সুমনা দাস নিজেই পুলিশের দ্বারস্থ হন। তাঁর অভিযোগ, গত ১৭ বছর ধরে স্বামী অনির্বাণ দাস তাঁকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করে আসছেন। সুমনার দাবি, দীর্ঘদিন ধরে অত্যাচার সহ্য করার পরই তিনি স্বামীর সঙ্গে আর না থাকার সিদ্ধান্ত নেন।
সুমনা দাস বলেন,
“আমি বছরের পর বছর মারধর সহ্য করেছি। সম্প্রতি মারধর করে আমার হাত ভেঙে দিয়েছে। সবকিছু সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তাই সিদ্ধান্ত নিই আর ওর সঙ্গে থাকব না। এখন আমাকে কালিমালিপ্ত করতে ড্রাইভারের নামে মিথ্যা মামলা করা হচ্ছে।”
থানার সামনেই মারধরের অভিযোগ
ঘটনার চাঞ্চল্য আরও বাড়ে, যখন সুমনা দাস অভিযোগ করেন যে থানার সামনেই তাঁর স্বামী তাঁকে মারধর করেছেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, মোহনপুর থানার সামনে পুলিশের উপস্থিতিতেই অনির্বাণ দাস তাঁর চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে গালে চড় মারেন।
সুমনা বলেন,
“পুলিশ না থাকলে হয়তো আরও বড় কিছু হয়ে যেত। পুলিশই আমাকে বাঁচিয়েছে।”
এই অভিযোগের ভিত্তিতেই পুলিশ অনির্বাণ দাসকেও গ্রেফতার করে। বর্তমানে স্ত্রী নির্যাতনের একাধিক ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা রুজু হয়েছে।
অনির্বাণের পাল্টা দাবি
অন্যদিকে, অনির্বাণ দাস সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, স্ত্রী সুমনা দাস পরিবারের সোনা ও মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে ড্রাইভারের সঙ্গে পালানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। গোপন সূত্রে খবর পেয়েই তিনি নাকি এয়ারপোর্টের আগেই পুলিশকে জানিয়েছিলেন।
অনির্বাণের বক্তব্য,
“আমার স্ত্রী প্রতারিত হয়েছে। আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। ড্রাইভারের সঙ্গে মিলে আমার সম্মান নষ্ট করার চক্রান্ত চলছে।”
আগেও বিতর্কে জড়িয়েছিলেন অনির্বাণ
এটা প্রথমবার নয়। এর আগেও ব্যারাকপুরের ওই বিখ্যাত বিরিয়ানি ব্যবসায়ী নানা কারণে পুলিশের নজরে এসেছিলেন বলে জানা যায়। ব্যবসার সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনের অশান্তি বারবার তাঁকে বিতর্কের কেন্দ্রে এনে ফেলেছে।
এখন কী অবস্থা?
এই মুহূর্তে তিনজনই—অনির্বাণ দাস, তাঁর স্ত্রী সুমনা দাস এবং চালক সমীর সেন—পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন বা আইনি প্রক্রিয়ার আওতায়। পুরো ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। পারিবারিক বিবাদ, প্রতারণা, অপহরণ ও গার্হস্থ্য হিংসা—সব দিক খতিয়ে দেখেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে তদন্তকারী আধিকারিকরা।
সব মিলিয়ে, ব্যারাকপুর ও মধ্যমগ্রামের এই বহুচর্চিত বিরিয়ানি ব্যবসায়ীর কেচ্ছা কেলেঙ্কারি যেন কিছুতেই থামছে না। সত্যি কী, মিথ্যে কী—তার চূড়ান্ত উত্তর দেবে তদন্তই। তবে আপাতত এই ঘটনা রাজ্যের অন্যতম আলোচিত পারিবারিক ও অপরাধমূলক কেসে পরিণত হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।



