Madhyamik Exam Problem : ভোটার তালিকার স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা SIR প্রক্রিয়াকে ঘিরে রাজ্য প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে টানাপোড়েন নতুন নয়। কিন্তু সেই প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব যে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে রাজ্যের লক্ষ লক্ষ পড়ুয়ার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায়, তা হয়তো এতদিন কল্পনাও করা হয়নি। এবার সেই আশঙ্কাই বাস্তব রূপ নিতে চলেছে বলে মনে করছেন শিক্ষামহলের একাংশ।
কারণ, SIR প্রক্রিয়ার চাপেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে চলতি বছরের মাধ্যমিক পরীক্ষা। এই পরীক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রায় ৯ লক্ষ ৭১ হাজারেরও বেশি ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ। পরীক্ষার ঠিক আগে এই অনিশ্চয়তা স্বাভাবিকভাবেই বাড়িয়ে তুলেছে অভিভাবক ও শিক্ষকদের উদ্বেগ।
কোথায় তৈরি হচ্ছে সমস্যা?
মাধ্যমিক পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক শিক্ষকের প্রয়োজন হয়। কেন্দ্র পরিচালনা, অবজার্ভার, প্রশ্নপত্র বিতরণ, উত্তরপত্র সংগ্রহ এবং পরীক্ষাকেন্দ্রে নজরদারির মতো দায়িত্বে যুক্ত থাকেন শিক্ষকরা। পর্ষদের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি ২০ জন পরীক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষককে গার্ড দিতে হয়।
চলতি বছরে মাধ্যমিক পরীক্ষা পরিচালনার জন্য আনুমানিক ৫২ হাজার শিক্ষক প্রয়োজন। অথচ ঠিক সেই সময়েই রাজ্যের ২০ থেকে ৩০ হাজার শিক্ষক বর্তমানে SIR প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত, যাঁদের অধিকাংশই বুথ লেভেল অফিসার (BLO) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—
👉 মাধ্যমিক পরীক্ষার সময় এই শিক্ষকরা কি SIR-এর কাজ ছেড়ে পরীক্ষার দায়িত্ব পালন করতে পারবেন?
👉 নাকি একসঙ্গে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে তৈরি হবে বড়সড় সমস্যা?
পর্ষদের উদ্বেগ, কমিশনের পাল্টা যুক্তি
শুক্রবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের সভাপতি রামানুজ গঙ্গোপাধ্যায় স্পষ্টভাবেই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্য, একাধিকবার নির্বাচন কমিশন এবং মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে চিঠি পাঠানো হলেও এখনও পর্যন্ত কোনও স্পষ্ট জবাব পাওয়া যায়নি।
পর্ষদের দাবি,
“শিক্ষকদের কয়েক ঘণ্টার জন্য ছুটি দিলেই হবে না। পরীক্ষার দিনগুলিতে তাঁদের পুরো দিনের জন্য SIR কাজ থেকে অব্যাহতি প্রয়োজন। কারণ, শিক্ষকদের স্বাক্ষর ছাড়া প্রশ্নপত্র দেওয়া বা উত্তরপত্র সংগ্রহ—কোনওটাই সম্ভব নয়।”
অন্যদিকে, মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল এই আশঙ্কাকে অতিরঞ্জিত বলে মনে করছেন। তাঁর বক্তব্য,
“রাজ্যে মোট শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় ৯ লক্ষ। তার মধ্যে ২০–৩০ হাজার শিক্ষক SIR-এর কাজে যুক্ত থাকায় মাধ্যমিক পরীক্ষায় অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।”
এই দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট—সমন্বয়ের অভাব এখনও কাটেনি।
কেন বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ?
মাধ্যমিক পরীক্ষা শুধুমাত্র একটি পরীক্ষা নয়, বরং পড়ুয়াদের জীবনের প্রথম বড় বোর্ড পরীক্ষা। এই সময় মানসিক স্থিরতা ও পরীক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ সবচেয়ে জরুরি। কিন্তু প্রশাসনিক টানাপোড়েন সেই পরিবেশকেই অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে বলে আশঙ্কা।
বর্তমানে SIR-এর হিয়ারিং পর্ব চলছে, ফলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের ওপর কাজের চাপ অত্যন্ত বেশি। একদিকে ভোটার তালিকা সংশোধনের দায়িত্ব, অন্যদিকে মাধ্যমিকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা—দুই দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করা বাস্তবে কতটা সম্ভব, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
অভিভাবকদের উদ্বেগ বাড়ছে
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অভিভাবকেরা। অনেকেরই প্রশ্ন—
✔ পরীক্ষার দিনে যদি পর্যাপ্ত শিক্ষক না পাওয়া যায়, তাহলে কি পরীক্ষা পিছোতে পারে?
✔ পরীক্ষাকেন্দ্রে শৃঙ্খলা ও নজরদারিতে কোনও ঘাটতি হবে না তো?
যদিও এখনও পর্যন্ত পরীক্ষা পিছোনোর কোনও সরকারি ইঙ্গিত নেই, তবুও অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে?
সব মিলিয়ে, SIR বনাম মাধ্যমিক পরীক্ষা এখন আর শুধুমাত্র প্রশাসনিক বিতর্ক নয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে রাজ্যের প্রায় ১০ লক্ষ পড়ুয়ার ভবিষ্যতের উপর। এখন দেখার, শেষ মুহূর্তে নির্বাচন কমিশন ও মধ্যশিক্ষা পর্ষদের মধ্যে সমন্বয় তৈরি হয় কিনা, নাকি এই টানাপোড়েন পরীক্ষার পরিবেশকেই প্রভাবিত করবে।
জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে থাকা পড়ুয়ারা এবং তাঁদের অভিভাবকরা আপাতত তাকিয়ে আছেন একটাই প্রশ্নের দিকে—
👉 সময়ে কি মিলবে সমাধান, নাকি অনিশ্চয়তার মধ্যেই দিতে হবে মাধ্যমিক পরীক্ষা?



