Digital Privacy Law : ভারতে কি বন্ধ হয়ে যেতে পারে হোয়াট্সঅ্যাপ? এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে দেশজুড়ে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টে হোয়াট্সঅ্যাপের গোপনীয়তা নীতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা হওয়ার পর নতুন করে এই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। স্পষ্ট ভাষায় সংবিধান মানার নির্দেশ দিয়ে আদালত জানিয়ে দিয়েছে—ভারতের নাগরিকদের তথ্য সুরক্ষার প্রশ্নে কোনও আপস করা হবে না।
মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে হোয়াট্সঅ্যাপের ২০২১ সালের গোপনীয়তা নীতি সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে কড়া অবস্থান নেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। আদালতে মেটা কর্তৃপক্ষের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আপনারা গোপনীয়তা নিয়ে খেলতে পারেন না। ভারতের নাগরিকদের তথ্য আমরা কোনও অবস্থাতেই ফাঁস হতে দেব না।” এই মন্তব্যের পরই প্রশ্ন উঠেছে—ভারতের আইন মানতে না পারলে কি সত্যিই দেশ ছাড়তে হবে হোয়াট্সঅ্যাপকে?
গোপনীয়তা নীতিতেই আপত্তি
এই মামলার মূল কেন্দ্রবিন্দু হোয়াট্সঅ্যাপের ২০২১ সালের আপডেট করা প্রাইভেসি পলিসি। অভিযোগ, ওই নীতির মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য মেটার অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে ভাগাভাগি করার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে, যা বাণিজ্যিক লাভের উদ্দেশ্যে ব্যবহার হতে পারে। কেন্দ্র সরকারের তরফে আদালতে জানানো হয়, এই নীতির অপব্যবহার হলে দেশের তথ্য নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা সওয়াল করে বলেন, হোয়াট্সঅ্যাপ কী ভাবে ব্যবহারকারীদের ডেটা ব্যবহার করছে, সেই বিষয়ে পূর্ণ স্বচ্ছতা নেই। তথ্য আদানপ্রদান যে শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত প্রয়োজনে সীমাবদ্ধ থাকছে, তার কোনও পরিষ্কার নিশ্চয়তা মেটা দিতে পারেনি বলেও অভিযোগ ওঠে।
মেটার যুক্তি মানেনি আদালত
হোয়াট্সঅ্যাপের হয়ে সওয়াল করা আইনজীবীরা দাবি করেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনেই সংস্থার গোপনীয়তা নীতি তৈরি করা হয়েছে এবং তথ্য কেবলমাত্র সংস্থার অভ্যন্তরেই ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এই যুক্তিতে সন্তুষ্ট হয়নি সুপ্রিম কোর্ট।
প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট করে জানান, ভারতের গোপনীয়তা সংক্রান্ত আইন ও ইউরোপ বা আমেরিকার নীতির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। আন্তর্জাতিক নিয়মের অজুহাতে ভারতের সংবিধান ও নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন করা যাবে না বলেও আদালত জানিয়ে দেয়।
“সংবিধান মানতে না পারলে ভারত ছাড়ুন”
শুনানির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত আসে যখন প্রধান বিচারপতি বলেন,
“যদি আপনারা ভারতের সংবিধান মেনে চলতে না পারেন, তা হলে এই দেশে ব্যবসা করার কোনও অধিকার আপনাদের নেই। নাগরিকদের গোপনীয়তা রক্ষাই আমাদের প্রথম দায়িত্ব।”
এই মন্তব্যের পরই জল্পনা শুরু হয়—চূড়ান্ত নির্দেশে হোয়াট্সঅ্যাপের উপর বড় নিষেধাজ্ঞা নেমে আসতে পারে কি না।
সাধারণ মানুষের বোধগম্য কি এই নীতি?
আদালত আরও প্রশ্ন তোলে, হোয়াট্সঅ্যাপের গোপনীয়তা সংক্রান্ত নথি কি একজন সাধারণ মানুষ সহজে বুঝতে পারবেন? বিশেষ করে যাঁরা আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেন, তাঁদের কাছে এই নীতিগুলি কতটা স্পষ্ট—তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্ট।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, কোনও অ্যাপের শর্তাবলি যদি ব্যবহারকারীর কাছে অস্পষ্ট থাকে, তবে সেটিকে প্রকৃত সম্মতি বলা যায় না।
অন্তর্বর্তী নির্দেশে বড় স্বস্তি
মঙ্গলবারের শুনানিতে অন্তর্বর্তী নির্দেশে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দিয়েছে, পরবর্তী শুনানি না হওয়া পর্যন্ত হোয়াট্সঅ্যাপ ব্যবহারকারীদের কোনও তথ্য মেটা বা অন্য কোনও সংস্থার সঙ্গে ভাগাভাগি করতে পারবে না। একই সঙ্গে গোপনীয়তা নীতি নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা আদালতে জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মেটা কর্তৃপক্ষকে।
এই নির্দেশে আপাতত স্বস্তি পেলেও, ভবিষ্যতে কী সিদ্ধান্ত আসে তার উপর নির্ভর করছে ভারতে হোয়াট্সঅ্যাপের ভবিষ্যৎ।
হোয়াট্সঅ্যাপ বন্ধ হয়ে যাবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই হোয়াট্সঅ্যাপ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়। তবে আদালতের অবস্থান স্পষ্ট—ভারতের আইন ও সংবিধানের ঊর্ধ্বে কোনও বহুজাতিক সংস্থা নয়। গোপনীয়তা নীতি সংশোধন না করলে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হতেই পারে।
ভারতের কোটি কোটি ব্যবহারকারীর দৈনন্দিন যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হোয়াট্সঅ্যাপ। তাই এই মামলার রায় শুধু একটি অ্যাপ নয়, ভবিষ্যতে দেশের ডিজিটাল গোপনীয়তা নীতির দিশা নির্ধারণ করবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।



