Weather News : শীতের আমেজ এখনও পুরোপুরি কাটেনি, অথচ তার মধ্যেই ভয় ধরানো গরমের পূর্বাভাস! তাপমাত্রার অস্বাভাবিক ওঠানামায় ইতিমধ্যেই নাজেহাল বঙ্গবাসী। মাঘ মাস পড়তেই অনেকেই দ্বিধায়—সোয়েটার আর চাদর কি তুলে রাখা উচিত, নাকি আরও কিছুদিন লাগবে? আবহাওয়াবিদদের ইঙ্গিত কিন্তু মোটেই স্বস্তিদায়ক নয়। পশ্চিমবঙ্গ-সহ দেশের একাধিক রাজ্যে শীত দ্রুত বিদায় নিচ্ছে, আর তার জায়গা দখল করছে আগাম গ্রীষ্মের রুক্ষতা।
যেখানে একদিকে জম্মু-কাশ্মীর ও হিমাচল প্রদেশে এখনও প্রবল তুষারপাত ও হাড়কাঁপানো ঠান্ডা চলছে, সেখানে দেশের সমতল অঞ্চলে শীত কার্যত গায়েব হওয়ার পথে। বিশেষ করে পূর্ব ভারত এবং বাংলায় তাপমাত্রা বাড়ছে অস্বাভাবিক গতিতে। আবহাওয়ার এই খামখেয়ালিপনা সাধারণ মানুষকে যেমন বিভ্রান্ত করছে, তেমনই আতঙ্কও বাড়াচ্ছে।
🌡️ ফেব্রুয়ারির শেষেই গরমের ছ্যাঁকা!
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয়ার্ধ থেকেই পশ্চিমবঙ্গে গরমের দাপট স্পষ্ট হয়ে উঠবে। দিনের তাপমাত্রা দ্রুত ৩২ থেকে ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছতে পারে। রাতে সামান্য ঠান্ডা থাকলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জানুয়ারির শেষভাগ থেকেই শীতের স্থায়িত্ব ভেঙে পড়েছে। এর ফলেই ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকেই শহরাঞ্চলে অস্বস্তিকর গরম অনুভূত হবে। কলকাতা, হাওড়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হুগলি-সহ একাধিক জেলায় দিনের বেলা রোদ কার্যত অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে।
🔥 মার্চেই কি ৪০ ডিগ্রি ছুঁবে পারদ?
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পূর্বাভাস এসেছে মার্চ মাস ঘিরে। আবহাওয়াবিদদের একাংশের মতে, মার্চের শেষ দিকেই কলকাতা ও আশপাশের এলাকায় তাপমাত্রা ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস স্পর্শ করতে পারে। যা সাধারণত এপ্রিলের শেষে দেখা যায়।
এপ্রিল মাসে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ বা হিট ওয়েভ-এর আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ, শিশু এবং শারীরিকভাবে দুর্বলদের জন্য এই গরম মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে।
🌍 বিশ্ব উষ্ণায়নের ভয়ংকর প্রভাব
এই আগাম ও তীব্র গরমের পিছনে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসছে বিশ্ব উষ্ণায়ন (Global Warming)। সাম্প্রতিক একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে—আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই চরম তাপমাত্রা কোটি কোটি মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে।
গবেষকদের দাবি, যদি বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা মাত্র ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পায়, তাহলে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন (৩৭০ কোটি) মানুষ ‘এক্সট্রিম হিট’-এর কবলে পড়বেন। বর্তমানে ২০১০ সালের পর থেকে বিশ্বের প্রায় ২৩ শতাংশ মানুষ ইতিমধ্যেই চরম গরমের প্রভাব অনুভব করছেন। আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই সেই সংখ্যা ৪১ শতাংশে পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা।
🌏 কোন কোন দেশ সবচেয়ে বেশি বিপদে?
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, নাইজেরিয়া, দক্ষিণ সুদান, লাওস এবং ব্রাজিলের মতো দেশগুলিতে তাপমাত্রা ভয়াবহভাবে বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিন্সের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলিও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে। জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় এই দেশগুলিতে চরম গরমের প্রভাব আরও গভীর হবে। শুধু গরম নয়, দীর্ঘ সময় ধরে গ্রীষ্মকাল চলার আশঙ্কাও রয়েছে। অর্থাৎ আগে যেখানে ৩-৪ মাস গরম থাকত, সেখানে এখন ৬-৭ মাস পর্যন্ত গরম অনুভূত হতে পারে।
🌬️ পশ্চিমবঙ্গে কেমন হবে পরিস্থিতি?
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। জানুয়ারির শেষ থেকেই শীতের দাপট কমতে শুরু করেছে। ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ পার হতেই গরম স্পষ্ট হয়ে উঠবে। মার্চে তীব্র গরম এবং এপ্রিলে একাধিক তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা রয়েছে।
২০২৬ সালে আবারও এল নিনো (El Niño) পরিস্থিতি ফেরার সম্ভাবনা থাকায় এবারের গ্রীষ্ম সাম্প্রতিক অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আবহাওয়াবিদরা।
❄️ ভবিষ্যতের জন্য কী বার্তা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই লক্ষ লক্ষ পরিবারকে বাধ্য হয়ে এয়ার কন্ডিশনার বা কুলিং সিস্টেমের উপর নির্ভর করতে হবে। এতে বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়বে, পরিবেশের উপর চাপও আরও বাড়বে। ফলে গরম কমার বদলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
🔚 উপসংহার
ফেব্রুয়ারির শেষেই গরমের ছ্যাঁকা, মার্চেই ৪০ ডিগ্রির দাপট—এই পূর্বাভাস নিঃসন্দেহে চিন্তার। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়, তা বর্তমানেই হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাচ্ছে। সময় থাকতেই সচেতন না হলে আগামী দিনগুলো যে আরও কঠিন হতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য।



