Chicken Neck Corridor : ভারতের ভৌগোলিক মানচিত্রে একটি সরু কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল শিলিগুড়ি করিডর—যা সাধারণভাবে পরিচিত ‘চিকেনস নেক’ নামে। মাত্র ২২–২৫ কিলোমিটার চওড়া এই করিডরই মূল ভূখণ্ড ভারতের সঙ্গে উত্তর-পূর্বের আটটি রাজ্যের একমাত্র স্থল সংযোগ। দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল বলে বিবেচিত হয়ে আসছে। বদলানো আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে সেই গুরুত্ব আরও বহুগুণ বেড়েছে।
বিশেষ করে চিন এবং বাংলাদেশের একাংশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বক্তব্যে বারবার চিকেনস নেক প্রসঙ্গ উঠে আসায়, ভারতের নিরাপত্তা মহলে উদ্বেগ নতুন করে বাড়ে। এই পরিস্থিতিতেই বড়সড় পদক্ষেপের পথে হাঁটল মোদী সরকার।
🔹 কেন এত গুরুত্বপূর্ণ চিকেনস নেক?
চিকেনস নেক দিয়ে প্রতিদিন উত্তর-পূর্ব ভারতে প্রবেশ করে—
✔️ সেনাবাহিনীর রসদ
✔️ জ্বালানি ও খাদ্যসামগ্রী
✔️ জরুরি চিকিৎসা ও প্রশাসনিক সরঞ্জাম
এই করিডরে সামান্য কোনও বিঘ্ন ঘটলে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে অসম, অরুণাচল প্রদেশ, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা ও সিকিম। যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পরিস্থিতিতে এই করিডর ভারতের ‘লাইফলাইন’ হিসেবেই পরিচিত।
🔹 ভূরাজনীতির চাপ: চিন ও বাংলাদেশের নজর
সম্প্রতি চিনের আগ্রাসী মনোভাব এবং বাংলাদেশে কিছু রাজনৈতিক মহলের উসকানিমূলক মন্তব্য চিকেনস নেকের নিরাপত্তা প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে। ভারতের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের যেকোনও সংঘাতের ক্ষেত্রে শিলিগুড়ি করিডর হতে পারে শত্রুপক্ষের প্রধান টার্গেট।
এই বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই কেন্দ্র সরকার শুধু সীমান্তে সেনা মোতায়েন নয়, পরিকাঠামোগত সুরক্ষা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
🔹 মাটির নীচে রেলপথ: কী পরিকল্পনা কেন্দ্রের?
কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব সম্প্রতি জানিয়েছেন, চিকেনস নেকের প্রায় ৪০ কিলোমিটার অংশে ভূগর্ভস্থ রেলপথ (Underground Railway Corridor) তৈরির একটি বিশাল পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পাবে নর্থইস্ট ফ্রন্টিয়ার রেলওয়ে (NFR)।
পরিকল্পনা অনুযায়ী—
📍 দার্জিলিং জেলার তিনমিলে হাট
📍 রাঙাপানি
📍 বাগডোগরা
এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা জুড়ে তৈরি হবে আন্ডারগ্রাউন্ড রেল করিডর। পাশাপাশি এই রুটের সংযোগ থাকবে উত্তর দিনাজপুর ও বিহারের কিষাণগঞ্জ দিকেও।
🔹 কেন আন্ডারগ্রাউন্ড রেল?
রেল মন্ত্রকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মাটির নীচে রেলপথ হলে—
✔️ শত্রুপক্ষের হামলার ঝুঁকি অনেকটাই কমবে
✔️ প্রাকৃতিক বিপর্যয়েও যোগাযোগ বজায় থাকবে
✔️ রেল অবকাঠামো গোপন ও সুরক্ষিত থাকবে
বিশেষ করে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই সুড়ঙ্গপথে সেনা, অস্ত্র ও রসদ পরিবহন অনেক দ্রুত এবং নিরাপদ হবে।
🔹 সেনাবাহিনীর জন্য কী লাভ?
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে—
🔸 বাগডোগরা বায়ুসেনা ঘাঁটির সঙ্গে যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হবে
🔸 বেঙ্গডুবি সেনা ক্যান্টনমেন্টের রসদ সরবরাহে গতি আসবে
🔸 উত্তর-পূর্বে সেনা মোতায়েন ও রোটেশন অনেক সহজ হবে
এক কথায়, চিকেনস নেক দিয়ে ভারতের সামরিক উপস্থিতি হবে আরও অটুট।
🔹 সাধারণ মানুষের জন্য সুফল
এই প্রকল্প শুধুমাত্র প্রতিরক্ষার জন্য নয়, সাধারণ মানুষের জীবনেও বড় প্রভাব ফেলবে।
✔️ উত্তর-পূর্বের সঙ্গে দেশের বাকি অংশের রেল যোগাযোগ আরও নির্ভরযোগ্য হবে
✔️ পণ্য পরিবহনের খরচ কমবে
✔️ পর্যটন ও বাণিজ্যে গতি আসবে
✔️ জরুরি পরিষেবা দ্রুত পৌঁছবে
দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের বাইরে থাকা উত্তর-পূর্ব ভারত এই প্রকল্পের মাধ্যমে মূল স্রোতে আরও শক্তভাবে যুক্ত হবে।
🔹 কবে শুরু হবে কাজ?
রেল মন্ত্রক সূত্রে জানা যাচ্ছে, বর্তমানে প্রাথমিক সমীক্ষা ও প্রযুক্তিগত সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। ভূগর্ভস্থ রেলপথ হওয়ায় পরিবেশ, ভূগোল ও নিরাপত্তা—সব দিক বিচার করেই চূড়ান্ত ছাড়পত্র দেওয়া হবে। খুব শিগগিরই এই প্রকল্পের বিস্তারিত রূপরেখা প্রকাশ করতে পারে কেন্দ্র।
🔹 বড় বার্তা স্পষ্ট
চিকেনস নেক নিয়ে এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মোদী সরকার একটাই বার্তা দিয়েছে—
ভারতের ভৌগোলিক দুর্বলতা আর দুর্বলতা থাকবে না।
উত্তর-পূর্বের নিরাপত্তা, সংযোগ ও উন্নয়ন—তিনটি ক্ষেত্রেই এই আন্ডারগ্রাউন্ড রেলপথ ভবিষ্যতে গেমচেঞ্জার হতে পারে।



