উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা মানেই ভবিষ্যতের এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। অথচ সেই পরীক্ষার দিনেই ঘটে গেল এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা। মামার সঙ্গে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছেও পরীক্ষা না দিয়েই নিখোঁজ হয়ে গেল এক ছাত্রী। পরীক্ষা শেষে বাড়ি না ফেরায় শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। তদন্তে নেমে পুলিশ যা জানতে পারল, তাতে রীতিমতো অবাক পরিবার থেকে শুরু করে গোটা এলাকা।
ঘটনাটি ঘটেছে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার Sabang এলাকার এক উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর ক্ষেত্রে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ ছাত্রীর বয়স ১৮ বছর ৫ মাস। সে এলাকারই একটি স্কুলের ছাত্রী এবং চলতি বছরে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় বসেছিল।
মামার সঙ্গেই রওনা, কিন্তু পরীক্ষাকক্ষে আর ঢোকা হল না
অন্যান্য দিনের মতোই ওই দিন সকাল প্রায় ৯টা নাগাদ ছাত্রীটি বাড়ি থেকে বের হয় পরীক্ষাকেন্দ্রের উদ্দেশে। পরীক্ষাকেন্দ্র ছিল Chandkuri High School। প্রতিদিনের মতোই মামার সঙ্গে বাইকে বা গাড়িতে করে সেখানে পৌঁছয় সে। মামা পরীক্ষাকেন্দ্রের বাইরে ভাগ্নিকে নামিয়ে দিয়ে চলে আসেন।
সবকিছুই তখন স্বাভাবিক। কিন্তু বিপত্তি শুরু হয় পরীক্ষা শেষের পর।
পরীক্ষা শেষে মামা ফের পরীক্ষাকেন্দ্রে আসেন ভাগ্নিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। অন্যান্য পরীক্ষার্থীরা একে একে বেরিয়ে এলেও ভাগ্নির দেখা নেই। সময় গড়াতে থাকে, স্কুল চত্বর ফাঁকা হয়ে যায়। দুশ্চিন্তায় পড়ে মামা শেষ পর্যন্ত স্কুলের ভিতরে ঢুকে শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
সেখানেই ঘটে চমকপ্রদ ঘটনা।
“আপনার ভাগ্নি আজ পরীক্ষা দেয়নি”—শুনেই হতবাক মামা
শিক্ষকদের থেকে জানা যায়, ওই ছাত্রী সেদিন পরীক্ষাকক্ষে ঢোকেইনি। এমনকি হাজিরা তালিকাতেও তার নামের পাশে অনুপস্থিত চিহ্ন রয়েছে। এই কথা শুনে চক্ষু চড়কগাছ মামার। কারণ, তিনি নিজেই তো ভাগ্নিকে পরীক্ষাকেন্দ্রের গেটে নামিয়ে দিয়েছিলেন!
পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা শিক্ষকরা জানান, আগের দু’টি পরীক্ষায় ওই ছাত্রী নিয়মিত উপস্থিত ছিল। হঠাৎ করে পরীক্ষার দিনে তার অনুপস্থিতি নজরে পড়তেই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়।
চাঁদকুড়ি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক বাসু হেমব্রম জানান, “একজন পরীক্ষার্থী আগের পরীক্ষাগুলো দেওয়ার পর হঠাৎ অনুপস্থিত থাকায় আমরা বিষয়টি সংশ্লিষ্ট স্কুলের প্রধান শিক্ষককে জানাই। পরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায়, সে বাড়ি থেকে পরীক্ষা দিতে বেরিয়েছিল, কিন্তু পরীক্ষাকক্ষে ঢোকেনি।”
প্রধান শিক্ষকের দাবি অনুযায়ী, মামা ভাগ্নিকে স্কুল গেট পর্যন্ত পৌঁছে দিলেও ছাত্রীটি গেটের ভিতরে ঢোকেনি। বাইরে থেকে সে কোথায় গিয়েছে, তা কেউ জানে না।
পরিবারে নেমে আসে আতঙ্ক, থানায় নিখোঁজ ডায়েরি
ঘটনা জানাজানি হতেই ছাত্রীর পরিবারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজন—সবাই মিলে সম্ভাব্য জায়গায় খোঁজ শুরু হয়। কিন্তু কোথাও কোনও সন্ধান না পেয়ে শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যায় সবং থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করা হয়।
পুলিশ সঙ্গে সঙ্গেই তদন্ত শুরু করে। পরীক্ষাকেন্দ্র সংলগ্ন এলাকা এবং আশপাশের রাস্তায় থাকা সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তে প্রেমের ইঙ্গিত, আগেও পালানোর ইতিহাস!
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক তদন্তে প্রেমের সম্পর্কের দিকেই ইঙ্গিত মিলছে। স্থানীয় কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, পরীক্ষার শুরুর আগে স্কুলের ইউনিফর্ম পরা এক তরুণীকে এক যুবকের সঙ্গে যেতে দেখেছেন তারা। যদিও তখন তারা জানতেন না যে মেয়েটি পরীক্ষার্থী, তাই আটকানোর চেষ্টা করেননি।
আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে তদন্তে। পুলিশ জানতে পেরেছে, ওই ছাত্রী এর আগেও তার প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিল। সেই সময় পরিবারের সদস্যরা তাকে বুঝিয়ে বাড়ি ফিরিয়ে এনে আবার স্কুলে ভর্তি করান।
পুলিশের অনুমান, এবারও একই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। তবে ছাত্রী সাবালিকা হওয়ায় বিষয়টি আইনগতভাবে আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।
প্রশ্নের মুখে নিরাপত্তা ও নজরদারি
এই ঘটনায় একাধিক প্রশ্ন উঠছে—পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছেও কীভাবে একজন পরীক্ষার্থী গেটের বাইরে থেকেই উধাও হয়ে যায়? পরীক্ষার দিনে পরীক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও নজরদারি আরও কড়া হওয়া উচিত কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, যত দ্রুত সম্ভব ছাত্রীর সন্ধান পাওয়ার চেষ্টা চলছে। পরিবারের পক্ষ থেকেও সকলকে অনুরোধ করা হয়েছে, কেউ কোনও তথ্য পেলে যেন থানায় জানান।
শেষ কথা
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনে এমন ঘটনা শুধু একটি পরিবার নয়, গোটা সমাজকেই ভাবতে বাধ্য করছে। প্রেম, ভবিষ্যৎ, নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে এই নিখোঁজের ঘটনা এখন এক বড় প্রশ্নচিহ্ন।



