Rinku Singh : বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ সময়ের মাঝেই জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তের মুখোমুখি হলেন ভারতীয় দলের তারকা ক্রিকেটার রিঙ্কু সিং। দীর্ঘদিন লিভার ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত শুক্রবার না ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন তাঁর বাবা খানচন্দ্র সিং। উত্তরপ্রদেশের গ্রেটার নয়ডার একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বাবার মৃত্যুতে স্বাভাবিকভাবেই ভেঙে পড়েছেন রিঙ্কু, কিন্তু ব্যক্তিগত শোককে পাশে সরিয়ে রেখে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন— বাবার শেষকৃত্য সম্পন্ন করেই দলের সঙ্গে যোগ দেবেন।
এই দৃশ্য অনেকের মনেই ফিরিয়ে এনেছে অতীতের স্মৃতি। বাবাকে হারিয়েও দেশের হয়ে মাঠে নেমেছিলেন সচিন তেন্ডুলকর, আবার পারিবারিক শোকের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন বিরাট কোহলি। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হল রিঙ্কু সিংয়ের নাম। দেশের স্বার্থে ব্যক্তিগত কষ্টকে উপেক্ষা করার এই মানসিকতাই একজন ক্রিকেটারকে আলাদা করে তোলে।
বাবার সংগ্রামেই গড়ে উঠেছে রিঙ্কুর জীবন
রিঙ্কু সিং আজ যে জায়গায় পৌঁছেছেন, তার নেপথ্যে সবচেয়ে বড় অবদান তাঁর বাবা খানচন্দ্র সিংয়ের। আলিগড়ের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম রিঙ্কুর। তাঁর বাবা পেশায় ছিলেন এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার সরবরাহকারী। গাড়ি চালিয়ে বাড়ি বাড়ি সিলিন্ডার পৌঁছে দিতেন। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সংসার চালিয়েছেন, আর সেই সঙ্গে ছেলের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
পরিবারের আর্থিক অবস্থা কখনওই স্বচ্ছল ছিল না। এক ভাই অটো রিকশা চালাতেন, আরেক ভাই একটি কোচিং সেন্টারে কাজ করতেন। রিঙ্কুও ক্রিকেটের পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহের জন্য বিভিন্ন জায়গায় ঝাড়ুদারের কাজ করেছেন। কিন্তু এত কষ্টের মধ্যেও বাবা খানচন্দ্র সিং কখনও ছেলের ক্রিকেট খেলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াননি। বরং সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেই তিনি চেষ্টা করেছেন রিঙ্কুর জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু জোগাড় করতে।
সংগ্রাম থেকে সাফল্যের পথে রিঙ্কু সিং
এই দীর্ঘ লড়াইয়ের ফল মিলতে শুরু করে ২০১৮ সালে। আইপিএল নিলামে কলকাতা নাইট রাইডার্স ৮০ লক্ষ টাকা দিয়ে রিঙ্কুকে দলে নেয়। সেদিন থেকেই যেন বদলে যায় তাঁর জীবনের গতিপথ। একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলে তিনি নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করেন।
এক সাক্ষাৎকারে রিঙ্কু জানিয়েছিলেন, আইপিএলের প্রথম মরশুমে পাওয়া টাকা দিয়েই তিনি বাবার ঋণ শোধ করেছিলেন। সেই মুহূর্তটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে গর্বের মুহূর্তগুলোর একটি। ধীরে ধীরে আর্থিক স্বচ্ছলতা আসে পরিবারে। আলিগড়ের ছোট ঘর ছেড়ে আজ তিনি প্রাসাদোপম বাড়ির মালিক। কিন্তু এত সাফল্যের মধ্যেও বাবার অবদান কখনও ভুলে যাননি রিঙ্কু।
বাবার স্মৃতি আঁকড়ে ধরেই মাঠে নামবেন
বাবা আজ আর পাশে নেই। কিন্তু তাঁর দেখানো পথ, তাঁর ত্যাগ আর সংগ্রামের গল্পই রিঙ্কুর সবচেয়ে বড় শক্তি। পরিবারের ঘনিষ্ঠ সূত্রের খবর, শেষকৃত্য সম্পন্ন করেই রিঙ্কু দলের সঙ্গে যোগ দেবেন। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে দেশের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত সহজ নয়, কিন্তু বাবার কাছ থেকেই এই আত্মত্যাগের শিক্ষা পেয়েছেন তিনি।
ক্রিকেট মহলের অনেকেই বলছেন, এই মানসিক দৃঢ়তাই রিঙ্কু সিংকে আলাদা করে চেনায়। তিনি শুধু একজন বিস্ফোরক ব্যাটসম্যান নন, বরং বাস্তব জীবনেও একজন যোদ্ধা। বাবার স্মৃতি বুকে নিয়েই তিনি মাঠে নামবেন, আর প্রতিটি রান উৎসর্গ করবেন সেই মানুষটিকে, যাঁর কাঁধে ভর করেই এই পথচলা।
উপসংহার
রিঙ্কু সিংয়ের গল্প শুধু ক্রিকেট সাফল্যের নয়, এটি একটি পরিবারের লড়াইয়ের গল্প। একজন বাবার আত্মত্যাগ, পরিবারের সীমাহীন কষ্ট আর এক ছেলের অদম্য ইচ্ছাশক্তি মিলেই তৈরি হয়েছে এই অধ্যায়। বাবাকে হারিয়েও দেশের জার্সি গায়ে চাপিয়ে মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে তাঁকে আরও সম্মানের আসনে বসায়।



