দক্ষিণ কলকাতার গড়িয়া অঞ্চলে ঘটে গেল এক হৃদয়বিদারক এবং চাঞ্চল্যকর ঘটনা, যা মুহূর্তের মধ্যেই এলাকায় আতঙ্ক ও শোকের ছায়া ফেলেছে। একটি বিউটি পার্লারের ভেতরে এক গৃহবধূকে নৃশংসভাবে খুন করার পর অভিযুক্ত যুবক নিজেও আত্মঘাতী হয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে। এই জোড়া মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্তব্ধ স্থানীয় মানুষজন, আর ঘটনাটি ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র তদন্ত।
মঙ্গলবার দুপুরে তেঁতুলতলা এলাকার একটি পার্লারে এই ঘটনা ঘটে। মৃতার নাম রূপবাণী দাস (প্রায় ৫০ বছর)। দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর ধরে তিনি ওই পার্লারে বিউটিশিয়ান হিসেবে কাজ করছিলেন। স্থানীয়দের মতে, তিনি অত্যন্ত শান্ত ও পরিশ্রমী স্বভাবের মানুষ ছিলেন এবং এলাকায় সকলের সঙ্গেই তাঁর সুসম্পর্ক ছিল।
ঘটনার দিনও অন্যান্য দিনের মতোই সকালবেলা তাঁর স্বামী অনুপকুমার দাস তাঁকে বাইকে করে পার্লারের সামনে নামিয়ে দেন। এরপর তিনি নিজের কাজে চলে যান। সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ মোড় নেয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দুপুর ১২টার কিছু পরেই এক যুবক পার্লারের ভিতরে ঢোকেন। এরপর ওই যুবক ও রূপবাণীর মধ্যে কথাকাটাকাটি শুরু হয়। কী নিয়ে এই বিতণ্ডা, তা এখনও স্পষ্ট নয়, তবে মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে ওই যুবক আচমকা ধারালো অস্ত্র বের করে রূপবাণীর উপর হামলা চালান। গুরুতরভাবে আহত অবস্থায় তিনি মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত যুবক নিজেকেও আঘাত করেন বলে জানা যাচ্ছে।
প্রায় ১২টা ৪৫ মিনিট নাগাদ পার্লার থেকে ফোন যায় রূপবাণীর স্বামীর কাছে। তাঁকে জানানো হয়, পার্লারের ভিতরে গুরুতর গোলমাল চলছে। খবর পেয়েই তিনি তড়িঘড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছন। সঙ্গে ছিলেন এক আত্মীয়ও।
পার্লারে পৌঁছে তাঁরা যে দৃশ্য দেখেন, তা অত্যন্ত মর্মান্তিক। রক্তে ভেসে যাচ্ছে মেঝে, আর দু’জন মানুষ নিথর হয়ে পড়ে আছেন। সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেন।
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ। কলকাতা পুলিশ দু’টি দেহ উদ্ধার করে এবং তদন্ত শুরু করে। দেহ দু’টি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, অভিযুক্ত যুবকের সঙ্গে রূপবাণীর ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল। এমনকি তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও থাকতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এই সম্পর্কের টানাপোড়েন থেকেই এই মর্মান্তিক ঘটনার সূত্রপাত বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। যদিও পুরো বিষয়টি এখনও খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং অফিসিয়ালভাবে কিছু নিশ্চিত করা হয়নি।
এই ঘটনার পর থেকেই এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এমন ঘটনা তারা আগে কখনও দেখেননি। দিনের আলোয়, একটি কর্মস্থলের মধ্যে এমন ভয়ংকর ঘটনা ঘটায় সবাই আতঙ্কিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতা অনেক সময় মানসিক চাপ তৈরি করে, যা চরম পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। তাই এমন পরিস্থিতিতে সচেতন থাকা এবং প্রয়োজন হলে মানসিক সহায়তা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটির প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে—সম্পর্কের প্রকৃতি, ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি এবং অন্যান্য সম্ভাব্য কারণ সবকিছুই তদন্তের আওতায় রয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান এবং অন্যান্য প্রমাণ সংগ্রহ করে পুরো ঘটনাটি পুনর্গঠন করার চেষ্টা চলছে।
সব মিলিয়ে, এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতা কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।



