ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হলেও আজ পর্যন্ত ভারত একবারও ফিফা বিশ্বকাপের মূলপর্বে মাঠে নামতে পারেনি। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ, যেখানে কোটি কোটি মানুষ ফুটবল ভালোবাসে, সেই দেশের বিশ্বকাপ-অভিষেক না হওয়া অনেকের কাছেই বিস্ময়ের বিষয়। কিন্তু আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইতিহাসের এক পর্যায়ে ভারত বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছিল। তবুও সেই সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। আজও সেই সিদ্ধান্তকে ভারতীয় ক্রীড়াজগতের অন্যতম বড় আফসোস বলে মনে করা হয়।
ঘটনাটি ১৯৫০ সালের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের অনেক দেশ তখনও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। সেই সময় ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত হতে চলেছিল ফিফা বিশ্বকাপ। এশিয়া অঞ্চল থেকে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি দল বিভিন্ন কারণে নাম প্রত্যাহার করে নেয়। বার্মা, ফিলিপাইন এবং ইন্দোনেশিয়া প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ানোয় ভারত কার্যত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিশ্বকাপের মূলপর্বে জায়গা পেয়ে যায়।
এটি ছিল ভারতীয় ফুটবলের জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। দেশের ফুটবল তখন ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক পরিচিতি পাচ্ছিল। কোচ সৈয়দ আবদুল রহিমের নেতৃত্বে একটি প্রতিভাবান দল গড়ে উঠছিল। দলে ছিলেন শৈলেন মান্না, আহমেদ খান, মেওয়ালাল এবং আরও বেশ কয়েকজন দক্ষ ফুটবলার। অনেকের বিশ্বাস ছিল, বিশ্বকাপে অংশ নিলে ভারত আন্তর্জাতিক ফুটবলের মঞ্চে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরার বিরাট সুযোগ পেত।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সুযোগ পেয়েও ভারত কেন বিশ্বকাপে যায়নি?
দীর্ঘদিন ধরে একটি জনপ্রিয় গল্প প্রচলিত রয়েছে। বলা হয়, ভারতীয় ফুটবলাররা খালি পায়ে খেলতে অভ্যস্ত ছিলেন এবং ফিফা জুতো পরে খেলাকে বাধ্যতামূলক করায় ভারত অংশ নেয়নি। এই গল্পটি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে অনেকেই এটাকেই একমাত্র কারণ বলে মনে করেন। কিন্তু ফুটবল ইতিহাসবিদদের মতে, বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল।
প্রথমত, সেই সময় ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের আর্থিক অবস্থা খুব শক্তিশালী ছিল না। ব্রাজিলে দল পাঠানো, খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের যাতায়াত, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে বিপুল অর্থের প্রয়োজন ছিল। সদ্য স্বাধীন হওয়া ভারতের জন্য এমন ব্যয় বহন করা সহজ ছিল না।
দ্বিতীয়ত, ভ্রমণ ব্যবস্থাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। আজকের মতো সরাসরি বিমান পরিষেবা তখন ছিল না। ব্রাজিলে পৌঁছাতে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা বা একাধিক ধাপে যাত্রা করতে হতো। এতে সময়, অর্থ এবং সংগঠনের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতো।
তৃতীয় এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল প্রশাসনিক অগ্রাধিকারের প্রশ্ন। সেই সময় ভারতীয় ক্রীড়া প্রশাসনের অনেকেই অলিম্পিককে বিশ্বকাপের তুলনায় বেশি মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতা বলে মনে করতেন। ফলে ফুটবল বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। অনেক গবেষক মনে করেন, এই মানসিকতাই ভারতীয় ফুটবলের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে বড় ধাক্কা দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি ভারত ১৯৫০ সালে বিশ্বকাপে খেলত, তাহলে আন্তর্জাতিক ফুটবলে দেশের পরিচিতি অনেক দ্রুত বৃদ্ধি পেত। বিশ্বের সেরা দলগুলোর বিরুদ্ধে খেলার অভিজ্ঞতা ভারতীয় ফুটবলারদের উন্নত করতে সাহায্য করত। পাশাপাশি ফুটবলের প্রতি বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রতিভা তৈরির ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারত।
যদিও পরবর্তী সময়ে ভারত উল্লেখযোগ্য কিছু সাফল্য পেয়েছিল। ১৯৫১ এবং ১৯৬২ সালের এশিয়ান গেমসে স্বর্ণপদক জয় করে দেশ গর্বিত হয়েছিল। সেই সময়কে অনেকেই ভারতীয় ফুটবলের সোনালি যুগ বলে উল্লেখ করেন। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে উপস্থিত থাকার সুযোগ আর কখনও ফিরে আসেনি।
আজ সাত দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। ভারতীয় ফুটবল এখনও বিশ্বকাপের মূলপর্বে জায়গা করে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছে। আধুনিক অবকাঠামো, বিদেশি কোচ এবং পেশাদার লিগের মাধ্যমে পরিস্থিতি বদলানোর চেষ্টা চলছে। তবুও ১৯৫০ সালের সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক এখনও শেষ হয়নি।
অনেক ফুটবলপ্রেমীর মতে, এটি ছিল ভারতীয় ক্রীড়া প্রশাসনের অন্যতম বড় ভুল। আবার কেউ কেউ মনে করেন, সেই সময়ের আর্থিক ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করলে সিদ্ধান্তটি পুরোপুরি অযৌক্তিক ছিল না। তবে একটি বিষয় নিয়ে প্রায় সবাই একমত—১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে এমন এক অধ্যায়, যা আজও কৌতূহল, বিতর্ক এবং আফসোসের বিষয় হয়ে রয়েছে।
ফুটবলপ্রেমীদের কাছে তাই প্রশ্নটা এখনও একই—যদি ভারত সেদিন ব্রাজিলের মাটিতে খেলতে নামত, তাহলে কি আজ দেশের ফুটবল ইতিহাস অন্যরকম হতো? সেই উত্তর হয়তো কখনও জানা যাবে না। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় ১৯৫০ সালের সেই সুযোগ হারানোর গল্প চিরকালই ভারতীয় ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত রহস্যগুলোর একটি হয়ে থাকবে।



