কেন্দ্রে তৃতীয়বার সরকার গঠনের পর রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে দিল্লির রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা চলছে। সম্ভাব্য মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন, সাংগঠনিক রদবদল এবং জোট রাজনীতির ভবিষ্যৎ—এই তিনটি বিষয়কে ঘিরেই এখন জোর জল্পনা। এরই মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বহু বছর ধরে শূন্য থাকা উপ-প্রধানমন্ত্রী (Deputy Prime Minister) পদ।
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত উপ-প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ বা এই পদ পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়নি। ফলে বর্তমানে যা আলোচনা চলছে, তা মূলত রাজনৈতিক মহলের জল্পনা এবং বিভিন্ন সূত্রভিত্তিক প্রতিবেদনের উপর নির্ভরশীল।
কেন আবার আলোচনায় উপ-প্রধানমন্ত্রীর পদ?
ভারতের সংবিধানে উপ-প্রধানমন্ত্রী পদ বাধ্যতামূলক নয়। এটি সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল একটি পদ। অতীতে একাধিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই পদ তৈরি করা হলেও দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রে কোনও উপ-প্রধানমন্ত্রী নেই।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জাতীয় স্তরে বিজেপির সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস এবং সম্ভাব্য মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের আলোচনা শুরু হওয়ায় আবারও এই পদকে ঘিরে জল্পনা তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বড় জোট সরকার বা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজন হলে অতীতে এই ধরনের পদ ব্যবহৃত হয়েছে। যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
ভারতে শেষ কবে ছিলেন উপ-প্রধানমন্ত্রী?
ভারতের ইতিহাসে একাধিক বিশিষ্ট নেতা উপ-প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলেছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন লালকৃষ্ণ আডবাণী। তিনি ২০০২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর মন্ত্রিসভায় এই পদে দায়িত্ব পালন করেন।
এরপর থেকে মনমোহন সিংয়ের দুই দফার সরকার এবং নরেন্দ্র মোদীর টানা তিন দফার সরকার—কোনও ক্ষেত্রেই উপ-প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করা হয়নি।
ফলে প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই পদ কার্যত শূন্য রয়েছে।
কারা রয়েছেন আলোচনার কেন্দ্রে?
রাজনৈতিক মহলে বর্তমানে দুটি নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে।
অমিত শাহ
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলবিদ হিসেবে পরিচিত। দলীয় সংগঠন পরিচালনা থেকে শুরু করে নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
কিছু রাজনৈতিক মহলের মতে, যদি ভবিষ্যতে উপ-প্রধানমন্ত্রী পদ তৈরি হয়, তাহলে অমিত শাহ স্বাভাবিকভাবেই অন্যতম সম্ভাব্য মুখ হতে পারেন। তবে এই বিষয়ে বিজেপি বা কেন্দ্র সরকারের তরফে কোনও আনুষ্ঠানিক ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি।
নীতীশ কুমার
অন্যদিকে, বিহারের অভিজ্ঞ নেতা নীতীশ কুমারের নামও আলোচনায় উঠে এসেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকার কারণেই বিভিন্ন মহলে তাঁর নাম নিয়ে আলোচনা চলছে।
কিছু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের মতে, জোট রাজনীতির সমীকরণ বিবেচনায় নীতীশ কুমারকে গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে। তবে এটিও সম্পূর্ণরূপে রাজনৈতিক জল্পনার পর্যায়ে রয়েছে।
মন্ত্রিসভা রদবদলের সম্ভাবনা কতটা?
প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে, কেন্দ্রে সম্ভাব্য মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সূত্রভিত্তিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কয়েকজন নতুন সাংসদকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে এবং কিছু দফতরে পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বা প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়নি। ফলে সম্ভাব্য রদবদল নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই।
সংগঠনেও কি আসতে পারে পরিবর্তন?
বিজেপির কেন্দ্রীয় সংগঠনেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। দলীয় সূত্রের দাবি অনুযায়ী, ভবিষ্যতের নির্বাচনী প্রস্তুতি এবং সাংগঠনিক সম্প্রসারণকে সামনে রেখে নতুন দায়িত্ব বণ্টনের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
তবে এসব বিষয়েও এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়নি।
উপ-প্রধানমন্ত্রী পদের সাংবিধানিক অবস্থান কী?
অনেকেরই ধারণা, উপ-প্রধানমন্ত্রী একটি সাংবিধানিক পদ। বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন।
ভারতের সংবিধানে উপ-প্রধানমন্ত্রীর জন্য আলাদা কোনও সাংবিধানিক বিধান নেই। প্রধানমন্ত্রী চাইলে মন্ত্রিসভার কোনও সদস্যকে রাজনৈতিকভাবে এই মর্যাদা দিতে পারেন। তবে এর জন্য পৃথক সাংবিধানিক ক্ষমতা বা দায়িত্ব নির্ধারিত নয়।
অর্থাৎ, এই পদ মূলত প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বের প্রতীক হিসেবেই বিবেচিত হয়।
কেন বাড়ছে রাজনৈতিক আগ্রহ?
উপ-প্রধানমন্ত্রী পদ নিয়ে আলোচনার অন্যতম কারণ হল জাতীয় রাজনীতির পরিবর্তিত সমীকরণ। বড় রাজনৈতিক দল, জোটের ভারসাম্য এবং ভবিষ্যতের নির্বাচনী কৌশল—সব মিলিয়ে এই বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
তবে রাজনৈতিক জল্পনা এবং সরকারি সিদ্ধান্ত এক নয়। কোনও বিষয় নিয়ে আলোচনা চললেই তা বাস্তবায়িত হবে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
সরকার কী বলেছে?
এই মুহূর্তে কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে উপ-প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ, সম্ভাব্য নাম বা মন্ত্রিসভা রদবদল নিয়ে কোনও সরকারি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি। বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বও বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেননি।
ফলে অমিত শাহ বা নীতীশ কুমারের নাম নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা রাজনৈতিক মহলের জল্পনা হিসেবেই দেখা উচিত।
কী হতে পারে আগামী দিনে?
আগামী কয়েক মাসে যদি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ বা সাংগঠনিক পরিবর্তনের ঘোষণা হয়, তাহলে অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে। তবে বর্তমানে উপ-প্রধানমন্ত্রী পদে কাউকে নিয়োগ করা হবে কি না, কিংবা আদৌ এই পদ ফিরবে কি না—সে বিষয়ে কোনও সরকারি নিশ্চিত তথ্য নেই।
তাই দিল্লির রাজনৈতিক অন্দরে আলোচনা যতই তীব্র হোক না কেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতেই হবে। কেন্দ্র সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত উপ-প্রধানমন্ত্রী পদ নিয়ে সব সম্ভাবনাকেই রাজনৈতিক জল্পনার পর্যায়েই বিবেচনা করা উচিত।



