সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত সময় কাটানো নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে স্ক্রিন আসক্তি, ঘুমের সমস্যা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি নিয়ে বহুদিন ধরেই আলোচনা চলছে। সেই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্য সরকার ১৬ ও ১৭ বছর বয়সিদের জন্য একটি নতুন ‘সোশ্যাল মিডিয়া কারফিউ’ চালুর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে।
তবে একটি বিষয় শুরুতেই স্পষ্ট করা জরুরি—এই নিয়ম এখনও কার্যকর হয়নি। এটি একটি প্রস্তাবিত নীতি, যা নিয়ে সরকারের পর্যায়ে আলোচনা চলছে এবং সংসদীয় প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।
কী এই ‘সোশ্যাল মিডিয়া কারফিউ’?
প্রস্তাব অনুযায়ী, ১৬ ও ১৭ বছর বয়সি ব্যবহারকারীদের জন্য রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত নির্দিষ্ট সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে স্বয়ংক্রিয় সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হতে পারে।
এই সময়ের মধ্যে Facebook, Instagram-সহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশ বা নির্দিষ্ট কিছু ফিচার ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি ভিডিওর অটো-প্লে-এর মতো ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় ধরে প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখে এমন কিছু ফিচারেও বিধিনিষেধ আনার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
কেন এই পদক্ষেপের ভাবনা?
যুক্তরাজ্য সরকারের যুক্তি, রাতের ঘুমের সময় সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার কমানো গেলে কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের কারণে—
- পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব,
- মনোযোগ কমে যাওয়া,
- উদ্বেগ ও মানসিক চাপ বৃদ্ধি,
- পড়াশোনায় প্রভাব,
- এবং দীর্ঘ সময় বসে থাকার কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এই কারণেই বয়সভিত্তিক ডিজিটাল নিরাপত্তা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কারা এই নিয়মের আওতায় আসতে পারেন?
বর্তমান প্রস্তাব অনুযায়ী, এই ব্যবস্থা মূলত ১৬ ও ১৭ বছর বয়সি ব্যবহারকারীদের জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে।
সব বয়সের ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট রাত ১২টার পর বন্ধ হয়ে যাবে—এমন দাবি সঠিক নয়।
কবে থেকে কার্যকর হতে পারে?
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, এই সংক্রান্ত আইন বা বিল সংসদে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে সংসদে অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত এটি কার্যকর হবে না। আইন পাস হলে এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি সংস্থাগুলি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে তবেই নতুন নিয়ম চালু হতে পারে।
আইন ভাঙলে কী হতে পারে?
প্রস্তাবিত নীতিতে প্রযুক্তি সংস্থাগুলির ওপরও দায়িত্ব বাড়ানো হতে পারে।
যদি আইন কার্যকর হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মগুলি নির্ধারিত নিয়ম না মানে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা বা আর্থিক জরিমানার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। তবে চূড়ান্ত বিধিনিষেধ আইন পাসের পরই স্পষ্ট হবে।
সমালোচনার জায়গাও রয়েছে
এই প্রস্তাবকে ঘিরে সমর্থনের পাশাপাশি সমালোচনাও শুরু হয়েছে।
সমালোচকদের মতে, প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতন অনেক কিশোর VPN বা অন্য প্রযুক্তিগত উপায়ে এই ধরনের সীমাবদ্ধতা এড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। তাই শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞা নয়, ডিজিটাল সচেতনতা, পারিবারিক নজরদারি এবং স্বাস্থ্যকর অনলাইন অভ্যাস গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মত কী?
শিশু ও কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, রাতে নির্দিষ্ট সময়ের পর স্ক্রিন ব্যবহার কমানো ঘুমের মান উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে।
তবে তাঁরা এটাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন, শুধুমাত্র আইন করলেই সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান হবে না। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তি সংস্থাগুলির সম্মিলিত উদ্যোগই দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
শেষ কথা
কিশোরদের মধ্যে বাড়তে থাকা স্ক্রিন আসক্তি রোধে যুক্তরাজ্যের প্রস্তাবিত ‘সোশ্যাল মিডিয়া কারফিউ’ আন্তর্জাতিক মহলেও আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে এটি এখনও প্রস্তাবের পর্যায়ে রয়েছে এবং কার্যকর হওয়ার আগে আইনগত অনুমোদন প্রয়োজন।
আগামী দিনে এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তার প্রভাব কতটা ইতিবাচক হবে, নাকি প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে—সেদিকেই নজর থাকবে বিশেষজ্ঞ এবং নীতিনির্ধারকদের।



