ভারতের মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে যুক্ত হল নতুন এক মাইলফলক। দেশের প্রথম সম্পূর্ণ বেসরকারি অরবিটাল রকেট ‘বিক্রম-১’ (Vikram-1) সফলভাবে উৎক্ষেপণের মাধ্যমে ভারতের বেসরকারি মহাকাশ শিল্প নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। এই উৎক্ষেপণ শুধু একটি রকেটের সাফল্য নয়, বরং ভারতীয় স্পেস স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের সক্ষমতারও বড় প্রমাণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মিশন ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক উপগ্রহ উৎক্ষেপণের ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ বিক্রম-১?
বিক্রম-১ হল ভারতের প্রথম বেসরকারি সংস্থা Skyroot Aerospace-এর তৈরি অরবিটাল রকেট। স্বাধীনভাবে মহাকাশে উপগ্রহ পাঠানোর সক্ষমতা অর্জনের ক্ষেত্রে এটি দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
সরকার ২০২৩ সালে মহাকাশ খাতকে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য আরও উন্মুক্ত করার পর থেকেই একাধিক স্টার্টআপ নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করে। বিক্রম-১ সেই উদ্যোগের অন্যতম বড় ফলাফল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিক্রম-১ রকেটের প্রধান বৈশিষ্ট্য
এই রকেটে একাধিক আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে রয়েছে—
- পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে (Low Earth Orbit) প্রায় ৩৫০ কেজি পর্যন্ত পেলোড বহনের ক্ষমতা।
- হালকা কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী কার্বন কম্পোজিট দিয়ে তৈরি কাঠামো।
- উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সলিড-ফুয়েল বুস্টার।
- উন্নত 3D-প্রিন্টেড লিকুইড ইঞ্জিন, যা উৎক্ষেপণের দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করে।
এই প্রযুক্তিগুলি রকেটটিকে তুলনামূলকভাবে হালকা, কার্যকর এবং বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণের জন্য উপযোগী করে তুলেছে।
কী কী পেলোড বহন করেছে এই মিশন?
বিক্রম-১ মিশনে শুধু ভারতীয় নয়, আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের একাধিক প্রযুক্তিগত পেলোডও মহাকাশে পাঠানো হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—
- জার্মানির DCUBED-এর প্রযুক্তিগত পেলোড,
- ভারতের Graha Space-এর উপগ্রহ,
- Kosmoserve-এর রোবোটিক আর্মসহ বিভিন্ন গবেষণা সরঞ্জাম।
এর পাশাপাশি প্রতীকীভাবে একটি শিল্পকর্ম “Cosmic Bloom” এবং ১৮ ক্যারেট সোনায় নির্মিত একটি ক্ষুদ্র রকেটও এই মিশনের অংশ ছিল। সেখানে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণার পথিকৃৎ সি. ভি. রমন, বিক্রম সারাভাই এবং ড. এ. পি. জে. আব্দুল কালাম-এর প্রতিকৃতি খোদাই করা হয়েছে।
ভারতের বেসরকারি মহাকাশ শিল্পে নতুন গতি
ভারতের মহাকাশ খাতে গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। ২০২৩ সালের Indian Space Policy কার্যকর হওয়ার পর বেসরকারি সংস্থাগুলির জন্য মহাকাশ খাতের সুযোগ অনেকটাই বিস্তৃত হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে দেশে যেখানে হাতে গোনা কয়েকটি স্পেস স্টার্টআপ ছিল, বর্তমানে সেই সংখ্যা কয়েকশো ছাড়িয়েছে। এর ফলে গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
IN-SPACe-এর ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
বেসরকারি মহাকাশ সংস্থাগুলিকে নিয়ন্ত্রণ, অনুমোদন এবং সহায়তা দেওয়ার জন্য IN-SPACe গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
স্টার্টআপগুলির জন্য সিড ফান্ড, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সহায়তা এবং প্রযুক্তি গ্রহণে আর্থিক সহায়তার মতো একাধিক উদ্যোগ চালু হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ নীতিতেও শিথিলতা আনা হয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিও ভারতীয় মহাকাশ শিল্পে বিনিয়োগে উৎসাহিত হয়।
ভারতের মহাকাশ অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
বিশ্লেষকদের মতে, বিক্রম-১-এর সফল উৎক্ষেপণ ভারতের বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণ বাজারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে।
বিশ্বজুড়ে ছোট উপগ্রহ উৎক্ষেপণের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। সেই বাজারে ভারতীয় বেসরকারি সংস্থাগুলি প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে পারলে দেশের মহাকাশ অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে।
সরকারও আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ভারতের স্পেস ইকোনমিকে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়েছে।
উপসংহার
বিক্রম-১-এর সফল উৎক্ষেপণ ভারতের মহাকাশ অভিযাত্রায় একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এটি শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পরিচয় নয়, বরং সরকারি নীতি, বেসরকারি উদ্ভাবন এবং ISRO-র দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার সমন্বিত ফল।
আগামী দিনে যদি এই ধরনের আরও বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণ সফল হয়, তবে আন্তর্জাতিক মহাকাশ বাজারে ভারতের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভারতের মহাকাশ যাত্রা এখন আর শুধু সরকারি সংস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—এটি ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী শিল্পখাতে পরিণত হচ্ছে।



